
জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, শেয়ার কিংবা অন্য কোনো মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করে লাভ হলে সেই লাভের ওপর আয়কর দিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক করদাতার কাছে এখনো মূলধনি সম্পদ বিক্রয় থেকে অর্জিত আয় এবং সাধারণ আয় বা ব্যবসায়িক আয় এক বিষয় বলে মনে হয়। ফলে সম্পদ বিক্রয়ের সময় কর পরিশোধ করলেও পরবর্তী সময়ে আয়কর রিটার্নে সেই আয় কীভাবে দেখাতে হবে, কোন অংশ মূলধনি আয় হিসেবে গণ্য হবে এবং কত হারে কর দিতে হবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়।একজন ব্যক্তি করদাতা ২০ বছর আগে ২০ লাখ টাকায় একটি জমি কিনেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জমির দাম বেড়ে দাঁড়াল এক কোটি টাকা। তিনি জমিটি বিক্রি করলেন। প্রশ্ন হলো তাঁর আয় কত? ১ কোটি টাকা, নাকি ৮০ লাখ টাকা? আবার এই ৮০ লাখ টাকার ওপরই কি আয়কর দিতে হবে? জমি বিক্রয়ের সময় উৎসে কর হিসেবে যে অর্থ ইতিমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে, সেটির কী হবে?
২০২৬ সালের আয়কর আইনের সংশোধনের পর এসব প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন সম্পদ বিক্রি করে কত টাকা পাওয়া গেল এবং তার মধ্যে কতটুকু করযোগ্য মূলধনি আয়, দুটি বিষয় আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সেই আয় যথাযথভাবে আয়কর রিটার্নে দেখানোও জরুরি।
প্রথমেই একটি ভুল ধারণা দূর করা প্রয়োজন। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৫৮-এ সম্পদের অর্জনমূল্য ও মূলধনি আয় নির্ধারণের বিধান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিধান করদাতাকে তার সম্পদের সঠিক অর্জনমূল্য নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে সম্পদ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মূলধনি আয় হিসাব করতে সহায়তা করে। করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এ-সংক্রান্ত বিধান সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।কোনো সম্পদ বিক্রি করে যে পুরো অর্থ পাওয়া যায়, সেটিই মূলধনি আয় নয়। মূলধনি আয় মূলত সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি থেকে সৃষ্ট লাভ। অর্থাৎ সম্পদ বিক্রির পুরো অর্থ আয় নয়; অর্জনমূল্য, বিক্রয়মূল্য, মালিকানার সময়কাল ও প্রযোজ্য করহার বুঝেই নির্ধারণ করতে হবে মূলধনি আয়।ধরা যাক, একজন ব্যক্তি একটি জমি ১৫ লাখ টাকায় কিনেছেন। ক্রয়সংক্রান্ত আইনসংগত ব্যয়সহ তাঁর অর্জনমূল্য যদি ২০ লাখ টাকা হয় এবং পরে তিনি সেটি ১ কোটি টাকায় বিক্রি করেন, তাহলে সরল হিসাবে তাঁর মূলধনি আয় ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ ১ কোটি টাকা তাঁর হাতে এসেছে ঠিকই, কিন্তু পুরো ১ কোটি টাকা আয় নয়।এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আয়কর আইন সম্পদের বিক্রয়মূল্যের ওপর নয়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অর্জিত মূলধনি আয়ের ওপর কর আরোপ করে। তাই করদাতার কাছে ক্রয়মূল্যের দলিল, আইনসংগত ব্যয়ের প্রমাণ ও বিক্রয়মূল্যের যথাযথ প্রমাণ থাকা জরুরি।তবে এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। সংশোধিত বিধানে কিছু ক্ষেত্রে মালিকানা হস্তান্তরের তারিখে সম্পদের ন্যায্য বাজারমূল্য এবং প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে যেটি বেশি, তা বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে দলিলে একটি মূল্য লিখে বাস্তবে অন্য মূল্য গ্রহণের মতো চর্চা করব্যবস্থায় আরও বেশি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
আয়কর আইনের সংশোধিত সংজ্ঞা অনুযায়ী মূলধনি সম্পদের পরিধি বেশ ব্যাপক। ভূমি বা ভূমিসহ স্থাপনা, বাড়ি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, ফ্লোরস্পেস, ব্যবসা বা উদ্যোগ এবং নির্দিষ্ট ধরনের সিকিউরিটিজ মূলধনি সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সোনা, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, রত্ন-হীরক, ধাতব মুদ্রা, মূল্যবান ধাতু, চিত্রকর্ম ও ক্লাবের সদস্যপদও নির্দিষ্ট শর্তে মূলধনি সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।অন্যদিকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ধারণ করা মজুত, ভোগ্যপণ্য বা কাঁচামাল মূলধনি সম্পদ নয়। একইভাবে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত নয়, এমন ব্যক্তিগত ব্যবহার্য কিছু সামগ্রীও এই সংজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো সম্পদ বিক্রি হলেই তা থেকে অর্জিত অর্থকে সরাসরি মূলধনি আয় বলা যাবে না। প্রথমে দেখতে হবে সম্পদটি আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী মূলধনি সম্পদ কি না এবং বিক্রয় বা মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মূলধনি আয় সৃষ্টি হয়েছে কি না। এই পার্থক্যটি করপরিকল্পনা ও রিটার্ন প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মূলধনি সম্পদ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো সম্পদটি কত দিন ধরে করদাতার মালিকানায় ছিল। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ধরনের মূলধনি সম্পদ অর্জনের পাঁচ বছরের মধ্যে বিক্রি বা হস্তান্তর করা হলে সেই মূলধনি আয় করদাতার করযোগ্য মোট আয়ের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং প্রযোজ্য নিয়মিত হারে কর দিতে হবে।অন্যদিকে সম্পদ অর্জনের পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর বিক্রি বা মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমে অর্জিত মূলধনি আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে আয়কর প্রযোজ্য হবে। এখানে করদাতাদের জন্য একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একই পরিমাণ মূলধনি আয় হলেও সম্পদটি কখন অর্জন করা হয়েছিল, তার ওপর করের ধরন ও হার নির্ভর করতে পারে। তাই জমি, ফ্ল্যাট বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ বিক্রয়ের আগে শুধু সম্ভাব্য লাভের হিসাব করলেই হবে না, সম্পদ অর্জনের তারিখ এবং অর্জনমূল্যের দলিলপত্রও যাচাই করতে হবে।
মূলধনি আয় বললেই সবার জন্য একই করহার প্রযোজ্য হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। আয়কর আইন ২০২৩ এর ৭ম তফসিলের অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোম্পানি, ব্যক্তিসংঘ ও ট্রাস্ট কর্তৃক মূলধনি সম্পদ বিক্রি বা মালিকানা হস্তান্তর থেকে অর্জিত মূলধনি আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে বিশেষ আয়করের বিধান রয়েছে। একইভাবে নির্দিষ্ট শ্রেণির করদাতার তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ লেনদেন থেকে অর্জিত মূলধনি আয়ের ওপরও ১৫ শতাংশ হারের বিধান রয়েছে।অন্যদিকে ব্যবসায়িক পণ্য নয়, এমন ব্যক্তিগত সোনা, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, রত্ন-হীরক, মূল্যবান ধাতু, চিত্রকর্ম, অ্যান্টিকস ও ক্লাবের সদস্যপদ বিক্রি বা মালিকানা হস্তান্তর থেকে অর্জিত মূলধনি আয়ের ওপর ৫ শতাংশ হারে করের বিধান রয়েছে। অতএব, করদাতার শ্রেণি, সম্পদের ধরন এবং মালিকানার সময়কাল তিনটিই কর নির্ধারণে বিবেচ্য।
জমির মালিক যখন কোনো ডেভেলপার বা রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারের কাছে জমি হস্তান্তর করেন, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। কারণ, তিনি অনেক সময় নগদ অর্থের পাশাপাশি এক বা একাধিক ফ্ল্যাটও পান।এই ক্ষেত্রে শুধু হাতে পাওয়া নগদ অর্থকে বিবেচনা করলে চলবে না। আয়কর আইন ২০২৩–এর ৫৮(৩) অনুযায়ী ডেভেলপারের কাছ থেকে পাওয়া নগদ অর্থ এবং প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য মিলিয়ে মোট প্রাপ্তি নির্ধারণ করে সেখান থেকে সম্পত্তির অর্জনমূল্য বাদ দিয়ে মূলধনি আয় নির্ধারণ করতে হবে। এ ধরনের মূলধনি আয়ের ওপর প্রযোজ্য ১৫ শতাংশ কর সংশ্লিষ্ট করবর্ষ এবং পরবর্তী দুই করবর্ষের মধ্যে সমান তিন কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে।এটি করদাতার জন্য কিছুটা স্বস্তির সুযোগ তৈরি করলেও একই সঙ্গে সঠিক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তাও বাড়িয়েছে। ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেই মূল্যায়নের ভিত্তি কী, চুক্তিতে কী উল্লেখ আছে, এসব নথি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।আয়কর আইনের সংশোধিত সংজ্ঞা অনুযায়ী মূলধনি সম্পদের পরিধি বেশ ব্যা