TAXNEWSBD
ভ্যাটের আওতায় আসছে লক্ষাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান
রবিবার, ২৪ মে ২০২৬ ১৭:৩৬ অপরাহ্ন
TAXNEWSBD

TAXNEWSBD

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল আকারের বাজেট প্রস্তাব করতে যাচ্ছে সরকার। নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের কারণে এবারের বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। তবে বড় বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ঋণের চাপ সামাল দেওয়া এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উপস্থাপন করা হতে পারে। চলতি অর্থবছর বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে ১ বছরের ব্যবধানে বাজেট বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে কর ও ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের সংস্কার এবং করজাল সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।এরই অংশ হিসেবে দেশের ৪৬৫টি ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য সংগঠনের কাছে সদস্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা চেয়েছে এনবিআর। এসব সংগঠনের আওতায় থাকা লক্ষাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, দেশের ভ্যাট জাল অত্যন্ত সীমিত। এ কারণে প্রতি বছর একই করদাতাদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে রাজস্ব।জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, সদস্যদের তালিকা চেয়ে একটি চিঠি দিয়েছে এনবিআর। মেম্বারশিপের তালিকা দিয়েছি।সংগঠন থেকে তালিকা নিয়ে করের আওতায় আনার প্রক্রিয়া সঠিক হবে না দাবি করে তিনি বলেন, সবাই সংগঠনের সদস্য হয় না। আমাদের দোকান মালিক সমিতির সদস্য প্রায় ৭০০, কিন্তু সারাদেশে দোকানের সংখ্যা তো কোটির ওপরে হবে। যারা দোকান করেন তাদের ট্রেড লাইসেন্স আছে, ট্যাক্স ও ভ্যাট দেন। সেখানে আবার নতুন করে সংগঠনের তালিকা ধরে করের আওতায় আনার যৌক্তিকতা নেই।তিনি বলেন, আমরা কর নেওয়ার বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু সেখানে কাঠামোগত ব্যবস্থা থাকবে। তার আলোকে ও এনবিআর তার কর্ম পরিধির ভেতরে থেকে কর আদায় করবে। কর আদায়ে যেন ব্যবসায়ীরা হয়রানির স্বীকার না হন, সেটি খেয়ালে রাখতে হবে।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভ্যাটের জন্য নিবন্ধিত থাকলেও নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয় মাত্র সাড়ে ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েও কার্যত নিষ্ক্রিয়। এই বাস্তবতায় আগামী এক বছরের মধ্যে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনগুলোর কাছ থেকে সদস্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর তা সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটে পাঠানো হবে। যাচাই-বাছাই শেষে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানের বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) নেই, তাদের আলাদা তালিকাও চাওয়া হয়েছে।জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ভ্যাট থেকেই ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের চাপ মোকাবিলায় করজাল সম্প্রসারণ ছাড়া বিকল্প দেখছে না সরকার।

শুধু ভ্যাট নয়, বিলাসবহুল গাড়ির ওপর করহারও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সাড়ে তিন হাজার সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির জন্য অগ্রিম আয়কর দুই লাখ টাকা হলেও আগামী বাজেটে তা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করা হতে পারে। একাধিক গাড়ি থাকলে করের পরিমাণ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে পরিবেশ সারচার্জের পরিবর্তে নতুন করে সম্পদ কর আরোপের চিন্তাও করছে সরকার।এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) সম্প্রতি পাঁচ হাজারের বেশি বিলাসবহুল গাড়ির কর নথি যাচাই করে বিপুল কর ফাঁকির তথ্য পেয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, এক হাজারের বেশি গাড়ির মালিক তথ্য গোপন করে কর ফাঁকি দিয়েছেন। এসব গাড়ির মধ্যে টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্জ, পোরশে, বেন্টলি ও রোলস-রয়েসের মতো ব্র্যান্ড রয়েছে।কর আদায়ে নতুন আরেকটি বড় পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে ব্যাংক লেনদেনের ওপর নজরদারি। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, দেশের বড় বড় কোম্পানির ডিলার, সাব-ডিলার ও পরিবেশকদের ব্যাংক লেনদেন বিশ্লেষণ করে কর আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কারণ এসব ব্যবসায়ীর বড় একটি অংশের ই-টিআইএন নেই এবং তারা আয়কর রিটার্নও দাখিল করেন না।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান সম্প্রতি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এনবিআরের সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে করদাতাদের ব্যাংক লেনদেন, আয়-ব্যয় ও সমাপনী স্থিতির তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর রিটার্নে যুক্ত হবে। এতে ভুয়া অডিট রিপোর্ট ও লেনদেন গোপনের প্রবণতা কমবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যাংক লেনদেনের ওপর কর আরোপের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। বড় করপোরেট ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের আওতায় সীমাবদ্ধ রাখা না গেলে সাধারণ সঞ্চয়কারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে ব্যাংক খাতের তারল্য ও ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।