
কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) রিটার্ন প্রতি মাসে জমা দেওয়ার বিধান বাতিল করে। বাজেট সহজীকরণের নামে তিন মাস অন্তর ভ্যাট জমার নতুন বিধানের প্রস্তাব দেয় এনবিআর। এ বিধান নিয়ে নানা সমালোচনা হলেও সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এনবিআরের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও কর্মকর্তারা। বাস্তবে বিষয়টি নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হওয়ায় নতুন করে ভাবতে হচ্ছে এনবিআরকে। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিতে বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, নতুন বিধান ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য করা হচ্ছে বলা হলেও, এ বিধানের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ অজানা। এখন প্রতি মাসে আগের মতো ভ্যাটের অর্থ জমা হচ্ছে না সরকারি কোষাগারে। এতে সরকারের নগদ অর্থ প্রবাহে সংকট তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সংস্থাটির সদস্য থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা ছিলেন। বৈঠকে বিশেষ করে চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে ভ্যাট ও ট্যাক্স আহরণ নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন উপস্থিত কর্মকর্তারা।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বিষয়টি নিয়ে কনসার্ন। তিনি ভ্যাটের রিটার্ন জমার নতুন বিধানে তৈরি হওয়া জটিলতা নিরসনে এনবিআরের কর্মকর্তাদের থেকে প্রস্তাব চেয়েছেন। বিষয়টি তিনি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরবেন বলেও জানান কর্মকর্তারা।
মাঠপর্যায়ে ভ্যাট আদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভ্যাটের রিটার্ন জমার এই নতুন নিয়মের কারণে চলতি মূলধন হিসেবে অপব্যবহার করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তিন মাস পর যখন এককালীন একটি বড় অঙ্কের ভ্যাট পরিশোধের সময় আসবে, তখন অনেক ব্যবসায়ী যদি সেই অর্থ অন্য ব্যবসায়িক খাতে খাটিয়ে ফেলেন, তাহলে একসঙ্গে বড় অঙ্কের ভ্যাট পরিশোধে ব্যর্থ হবেন। আর যারা স্বচ্ছ উপায়ে হিসাব রক্ষণ করেন, তাদের জন্য এ পদ্ধতি সুবিধার চেয়ে জটিলতাই বেশি তৈরি করবে। ভ্যাটের আরেকটি বড় কর্মকাণ্ড রেয়াত। যদিও রেয়াত নিয়ে হয়রানির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। প্রতি মাসে রেয়াত না নিয়ে তিন মাস পর রেয়াত নিতে গেলে হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হবে। সাপ্লাই চেইনের একটি প্রতিষ্ঠান তিন মাস পর রিটার্ন দিলে, তার ক্রেতা বা বিক্রেতার রেয়াত দাবির সময়সীমা এবং ইনভয়েস ট্র্যাকিং জটিল হয়ে পড়বে। এ ছাড়া মাসিক রিটার্নে কোনো ভুল হলে পরবর্তী মাসেই তা সংশোধন করা সহজ। কিন্তু ত্রৈমাসিক পদ্ধতিতে একটি ভুলের প্রভাব দীর্ঘ তিন মাসের ট্রানজেকশনের ওপর পড়বে। এর বাইরেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাঠপর্যায়ের ভ্যাট অফিসগুলোর জন্য এ পদ্ধতি প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। এনবিআর বর্তমানে প্রতি মাসে দাখিলপত্র যাচাই-বাছাই করে ফাঁকি রোধে কাজ করে। তিন মাসের ডাটা যখন একসঙ্গে ভ্যাট সার্কেল অফিসগুলোয় জমা পড়বে, তখন এত বেশি ট্রানজেকশন অডিট করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ভ্যাট বকেয়া পড়ার হার বাড়লে এনবিআরকে তা আদায়ের জন্য ঘন ঘন কারণ দর্শানোর নোটিশ, ডিমান্ড নোটিশ এবং সার্টিফিকেট মামলা করতে হবে। এতে রাজস্ব বিভাগের প্রশাসনিক ব্যয় এবং মামলার জট দুই-ই বাড়তে পারে। নতুন নিয়মের কারণে আরেকটি বড় জটিলতা হলো—ভোক্তা পণ্য ক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সরকারকে টাকা দিয়ে দিলেন, অথচ সরকার সেই টাকা নিজের কোষাগারে না এনে তিন মাসের জন্য একজন মধ্যস্বত্বভোগী বা ব্যবসায়ীর কাছে বিনা সুদে গচ্ছিত রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আর তিন মাস ধরে সরকারের শত শত কোটি টাকা ব্যবসায়ীদের হাতে আটকে থাকলে সরকার সেই অর্থের সময়মূল্য থেকে বঞ্চিত হবে। অনেক সময় সরকারকে তাৎক্ষণিক খরচ মেটাতে ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হতে পারে, যা জনগণের ওপর বাড়তি ঋণের বোঝা চাপবে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
কালবেলা