নতুন বাজেট প্রায় চূড়ান্ত। বিএনপি জোট সরকার বিশাল বাজেট করছে, যেখানে রাজস্ব আয়েরও বিরাট লক্ষ্যমাত্রা। তা অর্জনে এবার ভ্যাট খাতে বড় ধরনের সাহসী সংস্কার আনতে চাচ্ছে সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় দেশের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের জালের আওতায় আনা হচ্ছে।
কোনো ব্যবসাই আর ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া চালানো যাবে না। শুধু তাই নয়, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, ঋণ নেওয়া, ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া থেকে শুরু করে জরুরি সাত সেবায়ও ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হচ্ছে।
পাশাপাশি ভ্যাট বাড়ানোয় নতুন অর্থবছরে ব্যয়বহুল হবে মদ্যপান। এ পণ্যটিতে লিটারপ্রতি নতুন করে ভ্যাট দিতে হবে ৫০০ টাকা। তবে স্বর্ণালংকার, নারীদের কসমেটিকস, মোবাইলের সিম কার্ড আরো সহজলভ্য হবে। অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরকারি হিসাবেই দেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক কোটি ১৭ লাখ। নিয়ম অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় থাকার বাধ্যবাধকতা আছে। তবে কোটির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মাত্র সাত লাখ ৭৫ হাজার। ফলে বিপুলসংখ্যক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কোনো ভ্যাটই দেয় না। এ বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ আসছে বাজেটে।
কোনো প্রতিষ্ঠানই আর ভ্যাটের আওতার বাইরে থাকতে পারবে না। সে লক্ষ্যে বাজেটে সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেই ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এমন ভাবে শর্তের মারপ্যাঁচ রাখা হচ্ছে, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠানই চাইলেও আর ভ্যাট নিবন্ধন না করে পারবে না। নতুন অর্থবছরে জরুরি সাতটি সেবার ক্ষেত্রে অবশ্যই বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন) নিতে হবে।
ব্যবসায়ীরা গণহারে সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে শর্তের জালে ফেলে ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়ার পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। নিট পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসায়ের জন্য ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ নেওয়া, বিদ্যু-গ্যাস সংযোগ নেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রয়োজন হয়। এসব ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করলে তা ব্যবসা সহজীকরণের পথে অন্তরায়। সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল ব্যবসা সহজ করা। নতুন শর্ত যোগ করে তা কঠিন করা নয়। তবে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন যদি করতেই হয়, তাহলে বিআইএন নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম সম্পূর্ণ অনলাইনে, স্বয়ংক্রিয় ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে। এনবিআর কার্যালয়ে সরাসরি যাওয়ার প্রয়োজন থাকলে দুর্ভোগ ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়বে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাজেট প্রস্তাবনায় বলা হবে, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, এনবিএফআই বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব বা এসটিডি হিসাব খোলা ও পরিচালনা, ঋণ নেওয়া, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসে মার্চেন্ট হিসাব খোলা, ট্রেড বডির সদস্য পদ গ্রহণ-নবায়ন, প্রতিষ্ঠানের নামে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নেওয়া ও বিআরটিএ থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহনের নিবন্ধন নিতে ভ্যাট নিবন্ধিত হতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় আরো বলছে, ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বাজেটে ব্যবসায়ী বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যিনি আমদানি, ক্রয়, অর্জিত বা অন্য কোনোভাবে সংগ্রহ করা পণ্যের আকৃতি, প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য বা গুণগত পরিবর্তন না করে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি বা হস্তান্তর করেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা বলছেন, যাদের ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আসা উচিত, তাদের ভ্যাটের আওতায় আনতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা থাকলে সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানও ভ্যাট দিতে বাধ্য হবে। নিবন্ধন নিয়ে বিকাশ, নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে ভ্যাট দিতে পারবে। এতে অন্তত ২০ লাখ প্রতিষ্ঠান নতুন করে ভ্যাটের আওতায় আসবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা এক কোটি ১৭ লাখ, যা ২০১৩ সালে ছিল ৭৮ লাখ। এর মধ্যে ৯৯ শতাংশেরও বেশি হলো কুটির, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। যার ৭৪ শতাংশই গ্রামীণ এলাকার। তবে গ্রামীণ অর্থনীতির এই বিশাল বিস্তারের প্রতিফলন করের চিত্রে দেখা যাচ্ছে না।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ ৭৫ হাজার, যার মধ্যে পাঁচ লাখের সামান্য বেশি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট রিটার্ন দেয়। ভ্যাটের জাল বাড়াতে সরকার বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের বার্ষিক টার্নওভারের সীমা তিন কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টাকায় নামিয়ে এনেছে। ফলে ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন দ্রুত বাড়ছে। ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে দেশের ৪৬৫টি বণিক সমিতিকে সদস্য তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই উদ্যোগ নিলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অল্প পরিমাণে ভ্যাট আদায় করা সম্ভব। তবে এই অর্থ যেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। মাথায় রাখতে হবে এর ফলে যেন ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত কোনো অনানুষ্ঠানিক পেমেন্ট (ঘুষ) বা অবৈধ খরচ না করতে হয়।

