৩১ মে থেকে ফের শেয়ারবাজারে লেনদেনকরোনা মোকাবিলায় বাজেটে জরুরি বরাদ্দ থাকছে ১০ হাজার কোটি টাকা'পেট ভরে খেতে পারলেই হলো, বাজেটের খোঁজ রাখি না'ঈদের ছুটিতেও শুল্ক স্টেশন খোলা‘এবারের বাজেট বেঁচে থাকার বাজেট’
No icon

'পেট ভরে খেতে পারলেই হলো, বাজেটের খোঁজ রাখি না'

জাতীয় বাজেটে নেয়া অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ফলে কোটি কোটি টাকা আয়-ব্যয়ের হিসাব বদলে যায় অনেক সম্পদশালীর। নিজের স্বার্থেই এসব ব্যক্তিরা জাতীয় বাজেটে কি আসছে, আর কি আসছে না তার খোঁজ রাখেন। অন্যদিকে সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই বাজেট নিয়ে ভাবেন। বাজেট ঘোষণার পর কোন কোন জিনিসের দাম বাড়লো বা কমল তার হিসাব করতে বসেন। তবে বাজেট নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই কম আয়ের মানুষদের। তিন বেলা নিয়মিত খাবার জুটানোর সংগ্রামে ব্যস্ত তারা। এসব মানুষগুলো এবারে করোনার কারণে আছে আরো বিপাকে। নিম্নবিত্তের অনেকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কেমন বাজেট চান? জবাবে সবাই প্রায় একই উত্তর দেন, পেট ভইরা খাইতে পারলেই হয়, বাজেটের খোঁজ রাখি না। করোনায় কাজ নেই। করোনা কবে যাবে তাই কন। বাজেট কি, কেন বাজেট প্রণয়ন করা হয়, চলতি বাজেট কবে শেষ হবে, কবে নতুন বাজেট চূড়ান্ত হবে, আগের বাজেটে কি ছিল, নতুন বাজেটে কি এলো এসব বোঝেন না কম আয়ের মানুষরা। জানার আগ্রহও নেই তাদের। তারা আশায় আছে, কবে করোনা যাবে। করোনা গেলে আবারো স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসবে। আগের মত কাজ করতে পারবে। এতে কম বেশি তিন বেলা খাবারত জুটবে।

মিরপুর ১৩ নম্বর এলাকার ন্যাম সরকারি কোয়াটারের গেটের পাশে পাঁচ জন দিন মজুর বসে ছিল। আগামী ১১ জুন জাতীয় বাজেট ঘোষণা করবে সরকার এমন কথা জানিয়ে তাদের কাছে জানতে চাই, এবারের বাজেটে কি পদক্ষেপ নেয়া হলে আপনাদের জন্য ভাল হবে? বাজেটে যা বলা হবে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সে নিয়মে দেশের ব্যবসা বাণিজ্য চলবে।

উত্তরে দিন মজুরদের মধ্যে বয়সে তরুণ সিরাজ বলে উঠে, কিয়ের বাজেট? গত দুই মাসের বেশি সময় করোনার কারণে কাম নেই। করোনার আগে এই হানে ঘণ্টা খানিক বইসা থাকলেই কাজ জুইটা যাইত। আর অহন বেশির ভাগ দিন দুপুর পর্যন্ত বইসা থাইকা বস্তিতে ফিইরা যাই। করোনায় কাম অয়না। কেডা কাম দিবো?

সিরাজ বলে, কাম না হইলে খাইব কি? পরিবারে বুড়া বাপ মা ছোট বইন আছে। করোনা শুরু হওয়ার পরে থেইক্কা টাকা পায়সার কষ্টে আছি। বাজেট বুঝি না, করোনা কবে যাইব আর কবে আগের মতন কাজ পাইব তার খবর থাকলে কন।

মিরপুর ১৩ নম্বরের পুলিশ কনভেশন সেন্টারের সামনের রাস্তায় রিকশা নিয়ে মধ্যবয়সী ইদ্রিস আলী যাত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন। বাজেট কি, কবে ঘোষণা করা হবে এসব ধারণা দিয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় এবারের বাজেটে কি চান? ইদ্রিস আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি করোনার বিদায় চাই। করোনা আসার আগে আমরা ভালাই ছিলাম। আমি রিকশা চালাই। আমার দুই মাইয়া ও বউ বাসাবাড়িতে কাম করত। আমি আর আমার পরিবার যা কামাই করতাম তা দিয়ে ভালাই চলত। করোনা আসায় সব বদলাই দিছে।

ইদ্রিস আলীর কথায় জানা যায় করোনা আসার পর ছুটা বুয়া বাসায় ঢুকতে দিচ্ছে না বলে তার বউ আর দুই মেয়ের কাজ চলে গিয়েছে। করোনায় মানুষজন বাইরে কম বের হয়। তাই সে আর আগের মতো ভাড়া পায় না। আয় কমে গিয়েছে। সে গত এক ঘণ্টা এখানে বসে আছে। যাত্রী নেই। করোনাকালিন সংকটে রোজার দিন ভালো মন্দ খাবার দুরের কথা কোনো রকমে দিন কাটছে ইদ্রিস আলী ও তার পরিবারের।

ইদ্রিস আলী বলেন, বাজেট দিয়া কি করবো? করোনা চইলা গেলে সব কিছু আবার আগের মতন হলে বাঁচি।

রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার একটি ছয় তলা বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী শুকুর মিঞা। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে গত পাঁচ বছর থেকে নিরাপত্তা কর্মীর চাকরি করছে। তার কাছে জানতে চাই আগামী বাজেটে আপনার জন্য সরকারের কাছে কি চান? শুকুর মিঞা বলেন, গত পাঁচ বছর দারোয়ানের কাজ করি। এই বিল্ডিং এ আছি তিন বছর। একটি ফ্ল্যাটে সাধারণত একটি পেপার নিয়ে থাকে। কিন্তু যে দিন বাজেট দেয়া হয় তার পরের দিন সকালে বেশির ভাগ ফ্ল্যাটে পেপারওয়ালার কাছ থেকে দুইটা তিনটা বা তার বেশি পেপার নিয়ে থাকে। গত তিন বছর আমার বেতন বাড়েনি। এখন সব কিছু মিলিয়ে ৮ হাজার ৩০০ টাকা বেতন পাই। বাজেটে কি আসলো বা গেল তাতে আমার কি?

যৌনকর্মী জ্যোস্না বেগমের কাছে বাজেটে কি চাও জানতে চাওয়া হলে বলে, বাজেট আবার কি? এসব বুঝি না। বাজেট দিয়ে কি করবো ? ঐ সব বড় লোকেরা বুঝবে। আমাদের কাছে আসলে করোনা হবে এই ভয়ে খরিদ্দার আসে না। আয় না থাকায় এখন নিয়মিত তিন বেলা খাবার খেতে পারি না। সাহায্য চাইতে গেলে অধিকাংশ মানুষ আমাদের ফিরিয়ে দেয়। অল্প কিছু সাহায্য পেয়েছিলাম এলাকা থেকে। তা শেষ হয়ে গিয়েছে।

বাসা বাড়িতে কাজ করে মধ্যবয়সী মর্জিনা খাতুন। কেমন বাজেট চায় তার কাছে জানতে চাওয়া হলে উত্তরে মর্জিনা খাতুন বলে, কেমনে কই গো মা। পড়ালেহা জানি না। বাজেট বুঝি না। তয় বাজেটে মনে হয় বাবুর দুধের দাম বাড়ে।

তার সাথে কথা বলে জানা যায় এই বাসায় মর্জিনা খাতুন দুই বছর থেকে আছে। বাসার গৃহকর্তি কলেজে পড়ায়। একবার টেলিভিশনে বাজেট দেখার পর মর্জিনা খাতুনকে তার গৃহকর্তি ডেকে বলেছিল, বুয়া বাবুর দুধ হিসাব করে বানাবে। বাজেটে দুধের দাম বেড়েছে।