করোনায় মধ্যবিত্তরাও যাচ্ছেন সুপার শপে, আপত্তি ভ্যাটেরাজস্ব আহরণ ও বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কিত অর্থমন্ত্রীদ্রুত কাঁচামাল খালাসের দাবি, এনবিআর চেয়ারম্যানকে বিজিএমইএ’র চিঠিকরপোরেট কর কমানোর দাবি এফআইসিসিআইয়েরকরপোরেট কর কমানোর দাবি এফআইসিসিআইয়ের
No icon

বেনাপোলে শুল্ক ফাঁকি থেমে নেই

বেনাপোল দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর। বছরে প্রায় শত হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি রপ্তানি হয় এই বন্দর দিয়ে। দেশের বেশিরভাগ ব্যবসায়ী তাদের প্রযোজনীয় পণ্যের আমদানি রপ্তানিতে এই বন্দর ব্যবহার করেন। ফলে সরকার এই বন্দর থেকে প্রতি অর্থবছরে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে। উদ্বেগজনক খবর হচ্ছে, পণ্যের বৃহৎ আমদানি-রপ্তানির সুযোগে এখানে গড়ে উঠেছে বেশকিছু শুল্ক ফাঁকি চক্র। ফলে বেনাপোল বন্দরে মিথ্য ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এসব চক্র বেনাপোল কাস্টমস থেকে প্রতিনিয়ত শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্যর চালান নিয়ে যাচ্ছে।
এই শুল্ক ফাঁকি রোধ করা গেলে এখানে সরকারের আরো বেশি রাজস্ব প্রাপ্তি ঘটতো।

সংশ্লিষ্ট বন্দর কর্তৃপক্ষের এক হিসেবে জানা যায়, এই বন্দরে গেল ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯৯টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটেছে। যা থেকে সরকার অতিরিক্ত শুল্ক আদায় করেছে ২১ কোটি ৭০ লাখ ৯ হাজার ১২৫ টাকা।

এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এখানে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটেছিল ১১৪টি, যা থেকে শুল্ক আদায় করা হয় ৩১ কোটি ৯৮ লাখ ৪ হাজার ৩৯৪ টাকা এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটেছিল ১৮১টি। যা থেকে সরকার শুল্ক আদায় করেছিল ১৫ কোটি ৬৩ লাখ ৪১ হাজার ১৯৩ টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, বেনাপোল কাস্টমস-বন্দরের কতিপয় কর্মকর্তা, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকদের যোগসাজসে এই মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি বাড়ছে।

বেনাপোল কাস্টমসের শুল্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই মাসে ৫টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ধরা পড়ে। যা থেকে জরিমানা আদায় করা হয় ১ কোটি ১৯ লাখ ৯ হাজার ৩৭৯ টাকা, আগস্টে ৬টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা উদঘাটন করে জরিমানা আদায় করা হয় ১ কোটি ৬১ লাখ ২২ হাজার ৫১০ টাকা, সেপ্টেম্বরে ৫টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা থেকে আদায় হয় ৭২ লাখ ৬৫ হাজার ৯৮৬ টাকা, অক্টোবরে ৭টি ঘটনা থেকে আদায় হয় ১ কোটি ৯২ লাখ ৬২ হাজার ৭৫১ টাকা, নভেম্বর মাসে ৫টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা থেকে আদায় করা হয় ১ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮ টাকা, ডিসেম্বর মাসে ৭টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা থেকে আদায় হয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ৭ হাজার ৯৭৯ টাকা, জানুয়ারি মাসে ৭টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা থেকে আদায় করা হয় ১ কোটি ৯৮ লাখ ৬৬ হাজার ৭৬৬ টাকা, ফেব্রুয়ারি মাসে ৫টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা থেকে আদায় হয় ১ কোটি ১৪ লাখ ২৮ হাজার ১৩০ টাকা, মার্চ মাসে ৯টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা থেকে ২ কোটি ৯৬ লাখ ৫ হাজার ৮৯৬ টাকা আদায় করা হয়, এপ্রিল মাসে ৯টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা থেকে আদায় করা হয় ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৯১ হাজার ৮৮৩ টাকা, মে মাসে ৯টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা থেকে আদায় করা হয় ২ কোটি ৪৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮২৭ টাকা এবং জুন মাসে ৭টি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা থেকে আদায় করা হয় ৬০ লাখ ৫৪ হাজার ৮২৯ টাকা।

এই চিত্রে দেখা যায়, প্রতিমাসেই শুল্ক ফাঁকি চক্র তাদের মিশনে তৎপর। ফাঁকফোকর খুঁজে তারা সুযোগ তৈরির চেষ্টায় মরিয়া। কিছু ফাঁকির ঘটনা ধরা পড়লেও আরো অনেক ঘটনাই চোখের আড়ালে থেকে যায় বলে অনেকেই মনে করছেন। তাদের ধারণা, শুল্ক ফাঁকির এসব তৎপরতা রোধ সম্ভব হলে সরকারের রাজস্ব আরো কয়েকশ কোটি টাকা বেড়ে যেতো।

বেনাপোল কাস্টমস শুল্ক বিভাগের সহকারী পরিচালক নিপূণ চাকমা জানান, বেনাপোল দিয়ে কেউ যাতে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা না ঘটাতে পারে সেজন্য আমরা তৎপর আছি। তবে কিছুটা লোকবল ঘাটতি রয়েছে। তারপরও আগামিতে কেউ যাতে বড় ধরনের শুল্ক ফাঁকি দিতে না পারে সেজন্য সব ধরণের চেষ্টা আমাদের রয়েছে। শুল্ক ফাঁকি রোধে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

বেনাপোল সিঅ্যন্ডএফ এজেন্টের যুগ্ম সম্পাদক জামাল হোসেন বলেন, শুল্ক ফাঁকি বা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানির সাথে সরাসরি কতিপয় কাস্টমস কর্মকর্তা জড়িত। তাদের সম্মতি ছাড়া শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটতে পারেনা।

তিনি বলেন, সিএন্ডএফ এজেন্ট শুধুমাত্র মাল ছাড় করানোর দায়িত্ব পালন করে। শুল্ক ফাঁকি মূলত আমদানিকারক ও কাস্টমস-বন্দরের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে হয়ে থাকে।

যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির পক্ষে আমরা নয়। তবে এসব ঘটনার সাথে অবশ্যই কাস্টমসের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে শুল্ক ফাঁকি হতে পারেনা। শুল্ক ফাঁকি রোধে কাস্টমসকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে।

এ ব্যাপারে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার বেলাল হোসেন চৌধুরী বলেন, কতিপয় কাস্টমস কর্মকর্তা, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান, সিএন্ডএফ এজেন্টের সহযোগিতায় বেনাপোলে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি চলছে। তবে আমরা শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ধরতে পারলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। যার মধ্যে রয়েছে লাইসেন্স বাতিল, মামলা, অর্থদন্ডসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। জালিয়াতির মাধ্যমে পন্য আমদানি হলে তাতে কাস্টমস ছাড় দেয়না।