বড় করদাতারাই যখন ভরসা বিনিয়োগ করে যেভাবে কর কমাবেনরিটার্ন দেওয়ার কৌশলএক পাতার আয়কর রিটার্ন ফর্ম চালু করেছে এনবিআরহোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে ছাড়ের সময় বাড়ল
No icon

আইন সংশোধন করে রাজস্ব কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা দেয়া হয়েছে

আগামী অর্থবছরের ২০২০-২১ প্রস্তাবিত বাজেটে আইন সংশোধন করে ভ্যাট কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। রাজস্ব কর্মকর্তারা চাইলে কমিশনারের অনুমতি ছাড়াই নিজ এখতিয়ারধীন এলাকায় যেকোনো প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালাতে পারবেন। বকেয়া কর আদায়কারী হিসেবে উপকমিশনারের পরিবর্তে সহকারী কমিশনারদের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও কমিশনারের পরিবর্তে সহকারী কমিশনারদের ক্ষমতায়িত করা হয়েছে। রাজস্ব কর্মকর্তা এবং নবিস সহকারী কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এত ক্ষমতা দেয়ার কারণে তা অপব্যবহারের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, রাজস্ব কর্মকর্তারা এমনিতেই মাঠপর্যায়ে নানা দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে এনবিআরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। তার ওপর আইন সংশোধন এ ধরনের স্বেচ্ছাচারী হওয়ার মতো ক্ষমতা দেয়ায় হয়রানির মাত্রা চরমে পৌঁছবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থবিলের মাধ্যমে ৮৩ ধারায় নতুন উপধারা যুক্ত করে রাজস্ব কর্মকর্তাদের নিবন্ধিত বা নিবন্ধনযোগ্য ব্যক্তির উৎপাদনস্থল বা সরবরাহস্থল বা সেবা প্রদানস্থল বা ব্যবসাস্থল পরিদর্শন এবং মজুদপণ্য, সেবা, উপকরণ ও হিসাব পরীক্ষা করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে রাজস্ব কর্মকর্তাদের কমিশনার বা মহাপরিচালকের অনুমতি নিতে হবে না।

আগে সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ বা তল্লাশি করতে পারতেন, তাতেও কমিশনারের কাছ থেকে আগে অনুমোদন নিতে হতো।

আইনের ৯৫ ধারা সংশোধনের মাধ্যমে বকেয়া কর আদায়ে সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আগে উপকমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা বকেয়া কর আদায়কারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। অন্যদিকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ১২ ধারা সংশোধনে কমিশনারের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

এই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হল ভ্যাট কমিশনারেটের আওতায় দায়িত্বরত বিভাগীয় কর্মকর্তারা। সাধারণত সহকারী কমিশনাররা বিভাগীয় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আইনের ১২ ধারায় বলা ছিল, কমিশনার যথাযথ অনুসন্ধানের পর যদি সন্তুষ্ট হন যে, কোনো ব্যক্তি মূসক নিবন্ধনযোগ্য বা টার্নওভার কর তালিকাভুক্তিযোগ্য কিন্তু তিনি নিবন্ধন বা তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করেননি, তাহলে কমিশনার স্ব-উদ্যোগে ওই ব্যক্তিকে মূসক নিবন্ধিত বা টার্নওভার কর তালিকাভুক্ত করতে পারবেন।

বাজেটে ধারা সংশোধনীর পর, সহকারী কমিশনাররা চাইলে যে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন দিতে পারবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআই সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, রাজস্ব কর্মকর্তাদের এমন ক্ষমতা দেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।

রাজস্ব কর্মকর্তারা চাইলে অফিস তল্লাশি করবে, এতে কেউ বাধা দেবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে কমিশনারের অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। হুটহাট তল্লাশি চালিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে নিজেরা ফায়দা লোটার চেষ্টা করবে, তা হতে পারে না।

ব্যবসায়ী ঐক্য ফোরামের মহাসচিব ও এফবিসিসিআই পরিচালক আবু মোতালেব বলেন, করোনায় এমনিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারছেন না সাধারণ ব্যবসায়ীরা। এ কঠিন সময়ে রাজস্ব কর্মকর্তাদের তল্লাশির ক্ষমতা দেয়া হলে হয়রানি আরও বাড়বে। তাই এনবিআরের উচিত পুনর্বিবেচনা করা।

অবশ্য এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ে কমিশনারদের কাজের পরিধি অনেক বিস্তৃত। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় অপরিহার্য নয় বা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাই করতে পারেন- এমন কাজও কমিশনারদের করতে হচ্ছে।

এক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের কারণে অনেক সময় সেবাগ্রহীতার সেবা পেতে বিলম্ব হয়। তাই কমিশনারদের অযাচিত কাজের চাপ কমাতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা দ্রুত সেবা পাবেন।

এদিকে ভ্যাট ফাঁকি ঠেকাতে কঠোর উদ্যোগ নিয়েছে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। রফতানিমুখী শিল্প ছাড়া অন্য সব শিল্প-কারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পাশাপাশি ভ্যাটের রিটার্ন যাচাই করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিতে সংস্থাটি বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে। অডিট রিপোর্ট ও ভ্যাট রিটার্নের প্রদর্শিত বিক্রয় বা টার্নওভারের তথ্যে গরমিল পেলে তৎক্ষণাৎ ভ্যাট গোয়েন্দাকে জানাতে বলা হয়েছে।

গত ১৮ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো এক চিঠিতে ভ্যাট গোয়েন্দার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রায়শই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাণিজ্যিক নিরীক্ষাকালে ভ্যাট দফতরে জমা দেয়া রিটার্নে প্রদর্শিত বিক্রয় বা টার্নওভারের সঙ্গে বার্ষিক আর্থিক বিবরণী বা অডিট রিপোর্টে প্রদর্শিত বিক্রয় বা টার্নওভারের তথ্যে গরমিল দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ ভ্যাট কম পরিশোধ করতে দাখিলপত্রে বিক্রয় বা টার্নওভার কম দেখানো হয়।

আবার ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ পেতে আর্থিক বিবরণী বা অডিট রিপোর্টে বিক্রয় বা টার্নওভার বেশি দেখানো হয়। এ ধরনের কার্যক্রমের ফলে প্রতিষ্ঠানের অপ্রদর্শিত টার্নওভার থেকে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে, যা অনভিপ্রেত। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ভ্যাট আইনের পাশাপাশি ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এতে আরও বলা হয়েছে, শতভাগ রফতানিমুখী শিল্প ছাড়া অন্য সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা শিল্প-কারখানার ঋণ প্রস্তাব বিবেচনাকালে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পাশাপাশি অডিট রিপোর্ট ও ভ্যাট রিটার্নের প্রদর্শিত বিক্রয় বা টার্নওভার মিলিয়ে দেখা আবশ্যক।

অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তৎক্ষণাৎ ভ্যাট গোয়েন্দাকে জানাতে হবে। পরবর্তীতে যদি ব্যাংকে জমা দেয়া আর্থিক প্রতিবেদনের সঙ্গে ভ্যাট দফতরে জমা দেয়া রিটার্নের তথ্যে অসঙ্গতি পাওয়া যায়, তাহলে ঋণ অনুমোদনকারী কর্মকর্তাকে দায়ী করা হবে।

এ বিষয়ে ভ্যাট গোয়েন্দার মহাপরিচালক সৈয়দ মুসফিকুর রহমান  বলেন, ভ্যাট ফাঁকি রোধে ও আর্থিক ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিংয়ে স্বচ্ছতা আনতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি কার্যকর করা হলে শুধু যে ভ্যাট ফাঁকি বন্ধ হবে তা নয়, ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি অনেক হ্রাস পাবে।