বড় করদাতারাই যখন ভরসা বিনিয়োগ করে যেভাবে কর কমাবেনরিটার্ন দেওয়ার কৌশলএক পাতার আয়কর রিটার্ন ফর্ম চালু করেছে এনবিআরহোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে ছাড়ের সময় বাড়ল
No icon

ভ্যাট বাজেট এবার কেমন হলো

মাননীয় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট প্রস্তাবনায় নতুন ভ্যাট আইনে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছেন। এতে কতিপয় অংশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও প্রস্তাবনার সার্বিক মূল্যায়ন অত্যন্ত ইতিবাচক। গত বছর নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল এবং পরে অনেকটা কাটছাঁট করেই তা কার্যকর করা হয়। শুরুতে আইনটিতে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকবে এটা ধরে নিয়েই এনবিআর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আইনটি বাস্তবায়নের পথে নামে। এর একটি কারণ ছিল, আইনটি পাস হয় ২০১২ সালে এবং পরের বছর তা বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু তা দীর্ঘ সাত বছর পিছিয়ে যায় কতিপয় ব্যবসায়ী সংগঠনের নানা ওজর-আপত্তির মুখে। তবে সরকারের দৃঢ় ইচ্ছায় এনবিআর ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে তা এগিয়ে নেয়। বাস্তবায়ন পর্যায়ে দেখা গেল, আইনে বেশকিছু অসংগতি থাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসার জটিলতা বেড়েছে এবং রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এনবিআর এসব অসংগতি চিহ্নিত করে তা দূর করারও উদ্যোগ নেয়।

বর্তমানে ভ্যাট দেশের সর্ববৃহৎ রাজস্বের উৎস। মোট কর রাজস্ব আহরণে স্থানীয় পর্যায়ে এ ভ্যাট প্রায় ৩৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ অবদান (১,২৮,৮২৭ কোটি টাকা) রাখছে। আমদানি পর্যায়ের আহরণকৃত ভ্যাট যোগ করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ শতাংশ। ক্রমান্বয়ে ভ্যাটের পরিধি বাড়ছে এবং শিকড়ও সংহত হচ্ছে। এই কর যেমন ব্যবসায়ীদের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তেমনি ভোক্তাদের অর্থনৈতিক চরিত্র নির্ধারণে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে পালন করছে। ভ্যাটের বাজেট তাই এনবিআর, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বাজেট প্রস্তাবনায় নতুন ভ্যাটের আইনি কাঠামোয় সবার জন্য একটা ভারসাম্য সৃষ্টি করার প্রতিফলন বলে মনে হয়। ভ্যাটবিষয়ক এসব পরিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, আইনটি এখন আগের চেয়ে অনেক পরিপক্ক রূপ ধারণ করেছে।

বাজেটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি আনা হয়েছে উপকরণ কর নিয়ে। ভ্যাট আইনের সৌন্দর্য হচ্ছে কোন উৎপাদনে ব্যবহূত উপকরণের ওপর পরিশোধিত ভ্যাটের রেয়াত প্রদান করা। মোট উত্পন্ন পণ্যের উপকরণের ওপর প্রযোজ্য কর থেকে আগে পরিশোধ করা কর বাদ দেয়ার কারণে উৎপাদনকারীর করভার হ্রাস পায়। তবে ২০১২ সালের আইনটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখা যায়, উপকরণের কোনো সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করা নেই। একজন করদাতা প্রতিষ্ঠান তার কারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামালের পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য নানা ধরনের কল্যাণকর, ভ্রমণ, বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড, স্থায়ী সম্পদ ও স্থাপনা ও উন্নয়নমূলক ব্যয় উপকরণ হিসেবে দেখাবেন কিনা, সে প্রশ্ন সামনে চলে আসে। ফলে নিট ভ্যাটের পরিমাণ দৃশ্যমান হয়নি। এছাড়া আরো অনেক ব্যয় আছে, যা সরাসরি কাঁচামাল নয় এবং উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিতও নয়। এসব বিতর্ক এড়াতে এবারের ভ্যাট আইনের ধারা ২ (১৮)-এর সংজ্ঞায় এ উপকরণের বর্ণনা বা বিস্তৃতির সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এতে কাঁচামাল, মোড়কসামগ্রী, যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে শ্রম, ভূমি, ইমারতসহ স্থায়ী সম্পত্তি, সব ধরনের আসবাব, ভ্রমণ, আপ্যায়ন, ইন্টেরিয়র ডিজাইন, প্রাঙ্গণ ভাড়া ইত্যাদিকে এ উপকরণের আওতা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এই ব্যাখ্যার ফলে উপকরণের আওতা নিয়ে চলমান বিতর্ক আর থাকবে না। করদাতা ও ভ্যাট কর্মকর্তারা এখন নিশ্চিত হবেন কোনটিতে রেয়াত প্রযোজ্য হবে, কোনটিতে হবে না। এতে উৎপাদনের ওপর ভ্যাট আহরণ বেড়ে যাবে এবং উপকরণ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতাও দূর হবে।

একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে এবার ধারা ৪৬(২)(ঘ)-তে পরিবহন সেবাসংক্রান্ত ব্যয়ের ওপর ৮০ শতাংশ পর্যন্ত রেয়াত প্রদানের বিধান সংযোজন করা হয়েছে। ১৯৯১ সালের আইনে এই সুযোগ থাকলেও নতুন আইনে এটি ছিল না। এ বিধান সংযোজনে ব্যবসায়ীরা বাড়তি ছাড় পেলেন।

উপকরণ নিয়ে আরো দুটো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এই বাজেট প্রস্তাবনায় উপস্থাপিত হয়েছে রেয়াত গ্রহণের সময়সীমা বর্ধিত করা এবং উৎপাদনে ব্যবহূত আনুপাতিক হারে উপকরণের ওপর রেয়াত গ্রহণ করা। ভ্যাট আইনের ধারা ৪৬(১)(গ)-তে উপকরণ কর রেয়াতের গ্রহণের মেয়াদ দুই মেয়াদ বা দুই মাস নির্ধারিত ছিল। এখন এই মেয়াদ চার মেয়াদে উন্নীত করা হয়েছে। এতে উপকরণ কর সমন্বয় করতে অধিক সময় পাওয়ায় তিনি লাভবান হবেন। অন্যদিকে আইনের ধারা ৪৭(১) অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনে যতটুকু পরিমাণ উপকরণ ব্যবহার করা হবে, সেই পরিমাণ রেয়াত গ্রহণের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে কোনো কর মেয়াদে উৎপাদন পর্যায়ে পরিশোধযোগ্য ও পরিশোধিত করের পরিমাণ আরো স্পষ্ট হবে। এটি ব্যবসায়ীদের পুঁজির খরচ বাড়িয়ে দেবে মনে হলেও হিসাব সংরক্ষণের স্বার্থে এই আনুপাতিক ব্যবহারে কর প্রবর্তন ভ্যাট আহরণে অধিকতর স্বচ্ছতা এনে দেবে। তারা নিজেরাও জানতে পারবেন, কোন নির্দিষ্ট মেয়াদে (প্রতি মাসে) তারা কী পরিমাণ পণ্য তৈরি করছেন এবং এতে কত টাকার করদায়িতা সৃষ্টি হচ্ছে।

তবে এক্ষেত্রে উল্লিখিত উপকরণ রেয়াত ব্যবহারের মেয়াদের নির্দিষ্টকরণ (চার মাস) সংশোধনী ব্যবসায়ীদের জন্য গলার কাঁটা হতে পারে। কেননা একজন ব্যবসায়ী পুরো বছরের কাঁচামাল একবারেই আমদানি করতে পারেন। কিন্তু এই কাঁচামাল চার মাসের মধ্যে ব্যবহার করতে না পারলে তাদের রেয়াত তামাদি হয়ে যেতে পারে। এতে তাদের ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। প্রস্তাবিত এই সময়সীমা পুনর্বিবেচনা করার জন্য এরই মধ্যে এনবিআরে আলোচনা হয়েছে। অনেক ভ্যাটের কমিশনার এই সময়সীমা প্রত্যাহারের পক্ষে।

এবারের বাজেটে ভ্যাটের আরেকটি লক্ষণীয় সংযোজন হচ্ছে দাখিলপত্র প্রদানের সময়সীমা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে। ভ্যাট আইনের ধারা ৬৪(১)-এ দাখিলপত্র প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছিল। ওইদিন অফিস বন্ধ থাকলে তার আগের দিন জমা করার বিধান ছিল। এখন বাজেট প্রস্তাবনায় ১৫ তারিখ সরকারি বা সাপ্তাহিক ছুটি হলে পরের দিন তা বর্ধিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ধারা ৬৪-এ নতুন উপধারা (১ক)-এর বিধান সংযোজন করা হয়েছে এবং এতে বলা হয়েছে, কোনো বিশেষ অবস্থায় (দুর্যোগ, মহামারী, দৈবদুর্বিপাক বা যুদ্ধ) এনবিআর সরকারের অনুমোদন নিয়ে দাখিলপত্র পেশের সময়সীমা বর্ধিত করতে পারবে। ধারা ৬৪(১ খ)-এর মাধ্যমে এই বিধানের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা প্রদানের ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে এনবিআরকে। প্রকৃতপক্ষে, করোনার লকডাউন বা ছুটির কারণে অনেকে চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলের দাখিলপত্র পেশ করতে পারেননি। সরকার অধ্যাদেশ জারি করে এ বিধান প্রবর্তন করে ওই দুই মাসের দাখিলপত্র পেশের সময় ৯ জুন পর্যন্ত বর্ধিত করেছিল। এবার বাজেট প্রস্তাবনায় ভ্যাট আইনে অধ্যাদেশের বিধানটি অন্তর্ভুক্ত করা হলো। ফলে করদাতারা আইনে বর্ণিত কোনো সংগত কারণে জরিমানা ও সুদ ব্যতিরেকে প্রতি মাসের দাখিলপত্র পেশ করতে পারবেন। নতুন বিধানটি বিশেষ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের প্রতি আরো সংবেদনশীলতা সৃষ্টি করবে।

বাজেটে ভ্যাট আইনে নতুন ধারা ৮৬(৩) অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কোনো ভ্যাট মামলা নিষ্পত্তির জন্য সংক্ষিপ্ত বিচার বা ন্যায় নির্ণয়নের প্রবর্তন করা হয়েছে। ১৯৯১ সালের আইনে এ বিধান ছিল। এমনটি দ্য কাস্টমস অ্যাক্ট ১৯৬৯-তেও আছে। এই নতুন সংযোজনে কোনো অপরাধের ন্যায় নির্ণয়নের জন্য একজন ব্যবসায়ী চাইলে কোনো কারণ দর্শাও নোটিস ও শুনানি ব্যতিরেকে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কর্মকর্তা কর নির্ধারণ ও সংঘটিত অপরাধের বিচারাদেশ দিতে পারবেন। ফলে অনেক ভ্যাটের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং মামলার জট কমবে। ব্যবসায়ীরা মামলাজনিত কারণে দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে পারবেন এবং তাদের সময় ও খরচও বেঁচে যাবে।

এবারের বাজেটে ভ্যাট বিধিমালায় অব্যবহূত উপকরণ নিষ্পত্তি, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত পণ্যের নিষ্পত্তি এবং বর্জ্য বা উপজাত পণ্যের সরবরাহ বা নিষ্পত্তিকরণ প্রক্রিয়ার বিধান যোগ করা হয়েছে। বিধিমালায় ২৪ক, ২৪খ ও ২৪গ নামের এ তিনটি বিধির মাধ্যমে এসবের ব্যবস্থাপনা হবে। ২০১২ সালের আইন ও বিধিতে এ ধরনের কোনো সুযোগ না থাকায় মাঠ পর্যায়ে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং কোনো কোনো ব্যবসায়ী এসব পণ্য নিয়ে সংকটে পড়েছিলেন। বর্তমান বাজেট প্রস্তাবনায় সংযোজিত এই তিনটি উপবিধি ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তি এনে দেবে। তবে নতুন উপবিধিতে দুর্ঘটনা ঘটলে দুদিনের মধ্যে ভ্যাট অফিসকে জানাতে বলা হয়েছে। এই দুদিন সরকারি ছুটি থাকলে কী হবে, তা বলা নেই। অনেক ভ্যাট কমিশনার এই দুদিন-কে দুই কার্যদিবস করার সংশোধনীর জন্য মত দিয়েছেন।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাবনায় করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নানামুখী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করছেন। এ প্রসঙ্গে ভ্যাটের অংশে তিনি কভিড-১৯-সংশ্লিষ্ট টেস্ট কিটস ও সামগ্রীর ওপর থেকে ভ্যাটের হার শূন্য করার প্রস্তাব করেছেন। পৃথক এসআরও জারির মাধ্যমে উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে এই ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা এসব পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহে বিশেষ সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে আমদানি পর্যায়েও এসব সামগ্রীর ওপর শুল্ক-করাদি প্রত্যাহার করা হয়েছে। করোনাক্রান্তিতে জনগণের কাছে এসব সামগ্রী অধিকতর সহজলভ্য হবে।

তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার জন্য এবারের বাজেটে সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি করা হয়েছে। সিগারেটের বিভিন্ন স্তরের মূল্য ও সম্পুরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। যেমন নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য ৩৭ টাকা থেকে ৩৯ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে এবং সম্পূরক শুল্ক ৫৫ শতাংশ থেকে ৫৭ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যান্য উচ্চতর ও প্রিমিয়াম স্তরেও অনুরূপভাবে মূল্য বাড়ানো হয়েছে। এতে সিগারেট খাত থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আসবে বলে ধারণা করা হয়েছে। অন্যদিকে হাতে তৈরি বিড়ির মূল্য প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক একই রাখা হয়েছে। জর্দা ও গুলের মূল্য ও সম্পূরক শুল্ক উভয়েই বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রায় ৪০ শতাংশ করভার সৃষ্টি হয়েছে। তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের ওপর এই কর আরোপের ফলে এগুলো ব্যবহারকারীদের ওপর চাপ বাড়াবে। অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আহরণও ঊর্ধ্বমুখী হবে।

তবে বাজেট প্রস্তাবনায় সিগারেটের করভার বাড়ানো হলেও এর মূল্যটা ধূমপায়ীদের ক্রয় আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে আরো সুফল পাওয়া যেত। যেমন নিম্নস্তরের সিগারেট এখন প্রতিটি শলাকা ৩ দশমিক ৯০ টাকায় বিক্রি হবে। গ্রামের অনেক ধূমপায়ী একটা বা দুটো শলাকা সিগারেট কিনে অভ্যস্ত। কিন্তু বর্তমান দামটি এমন যে তাদের একটা শলাকা কিনতে গেলে ভাংতি হিসেবে খুচরা পয়সা বা টাকা (যা এখন সচরাচর দেখা যায় না) সঙ্গে বহন করতে হবে। এই অবশিষ্ট ভাংতি টাকা বা পয়সাটা দোকানদার বা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে চলে যাবে, যা অর্থনীতির ভাষায় ডেডওয়েট লস(হারভি রোজেন, ২০০২, পাবলিক ফিন্যান্স, বোস্টন: ম্যাকগ্র-হিল আরউইন)। এই খুচরা মূল্যটি রাউন্ড ফিগার(৪ টাকা বা ৫ টাকা) হলে ক্রেতা বা বিক্রেতার জন্য আরো সুবিধাজনক হতো এবং এতে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব সরকারের কাছে চলে আসত।

এবারের বাজেটে আগাম করে (অ্যাডভান্স ট্যাক্স) গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দেয়া হয়েছে। যারা উৎপাদনকারী তাদের আমদানির ওপর এই কর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর দ্বারা উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বাড়তি সুবিধা দেয়া হলো। অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে উৎপাদনকারীর রিটার্ন সিস্টেম যাচাই করে কাস্টম হাউজগুলো এ সুবিধা দিতে পারবে। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে রিটার্নের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভ্যাট কার্যালয়ের প্রত্যয়ন সন্নিবেশ করতে হবে। এই আগাম কর প্রবর্তনের অন্যতম যুক্তি ছিল ভ্যাট আইনের চেইন ইফেক্ট তৈরি করা এবং কমপ্লায়েন্স বৃদ্ধি করা। এজন্য একজন ব্যবসায়ী আমদানিকালে সিকিউরিটি মানি হিসেবে এই আগাম কর পরিশোধ করবেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর সমন্বয়ের পর বাকি অংশ ফেরত পাবেন। এবারের বাজেটে উৎপাদনকারীদের এই আগাম কর ১ শতাংশ হ্রাস করায় তাদের করভার অনেকটা লাঘব হবে।

এবারের বাজেটের যে পরিবর্তনটি আলোচনার ঝড় তুলেছে তা হলো, মোবাইল টকটাইম ও এর ডাটা ইউজের ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ভ্যাটসহ এখন মোবাইল টকটাইমের ওপর প্রায় ৩১ শতাংশ করভার প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ টকটাইমে ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ২৫ টাকা এনবিআর ভ্যাট হিসেবে পাবে। অনেকে এটির সমালোচনা করলেও বিশ্বে এই হার বিরল নয়। এই কর বৃদ্ধির অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে মোবাইলে বেশি কথা বলাকে নিরুৎসাহিত করা। অন্যদিকে রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য সিমের মাধ্যমে মোবাইল সেবাকে অত্যন্ত সংগঠিত খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সহসাই আহরণযোগ্য। এই বৃদ্ধির ফলে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণ হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী ভ্যাট নিয়ে আরো বেশ কয়েকটি পরিবর্তনের কথা বলেছেন। যেমন বকেয়া আদায়ের ক্ষেত্রে আগে ধারা ৯৫-এ ডেট রিকভারি অফিসার (ডিআরও) নামে একজন ডেপুটি কমিশনার পদস্থ থাকতেন। এখন এই ডিআরওর পদমর্যাদা সহকারী কমিশনার করা হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো ভ্যাট কমিশনারেট সদর দপ্তরে ডেপুটি কমিশনার পদস্থ থাকেন না। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি অন্য কাউকে দিয়ে করানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই পদটি সহকারী কমিশনারের পদমর্যাদার করায় বকেয়া আদায়ের গতি বেড়ে যাবে। অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করার লক্ষ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমিশনারের ক্ষমতা অধস্তন কর্মকর্তাদের অর্পণ করা হয়েছে। যেমন ধারা ৭৩-তে কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে কমিশনারের নিম্নের কর্মকর্তারাও ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েছেন। আবার ধারা ৮৩-তে এখন রাজস্ব কর্মকর্তা বা তার ওপরের কর্মকর্তা তার এখতিয়ারাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন, কাগজপত্র ও পণ্যের মজুদ পরীক্ষা করতে পারবেন। আগে এই ক্ষমতা অন্যদের ছিল না। তবে কোনো খাতাপত্র বা পণ্য জব্দ করতে কমিশনারের কাছে লিখিত অনুমোদন নেয়ার বিধান এখনো বহাল আছে। অধিকন্তু, পণ্য পরিবহনের সময় যানবাহনের প্রকৃতি ও নম্বর উল্লেখপূর্বক একটি চালানপত্র যানবাহনের সঙ্গে বহন করার জন্য নতুন শর্ত সংযোজন করা হয়েছে। এতে ভ্যাট মনিটরিং সহজ হবে এবং কর ফাঁকি রোধে ভূমিকা রাখবে।

ভ্যাট আইনের অন্য আরেকটি বিধান পরিবর্তন নিয়ে ভিন্ন মত সৃষ্টি হয়েছে। ধারা ১২১ (২) ও ১২২(২)-এ কাস্টমস, অ্যাক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল কমিশনার ও আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আপিল দায়েরের ক্ষেত্রে আগে তর্কিত দাবিনামার ১০ শতাংশ পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। এখন সংশোধনীর মাধ্যমে এ হার ২০ শতাংশ এই বর্ধিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ হারে পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মামলার সংখ্যা হ্রাস করা কোনো ঠুনকো কারণে যেন কেউ আপিল দায়ের করে মামলা না করে। তবে এই সংশোধনী নিয়ে ভ্যাট কর্মকর্তাদের মাঝেও আলোচনা হয়েছে। কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করেন, কোনো মামলার সূত্রে একজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হাইকোর্টে রিট করে এই ২০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ ঠেকিয়ে দিতে পারেন। বর্তমানে ১০ শতাংশ আগাম পরিশোধের ক্ষেত্রেও এ রকম বেশকিছু রিট চলমান আছে। এখন হারটি বৃদ্ধি করার ফলে রিটের সংখ্যা লাগামহীন হতে পারে। অগ্রিম পরিশোধ বেশি করার চেয়ে বিচারকের বেঞ্চ বাড়িয়ে চলমান মামালাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করলে তাতে আরো ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৯৯১ সালের আইনের ধারা ২(খ)-তে বলা ছিল, একজন ব্যবসায়ী আপিল কমিশনারের কাছে আপিল করার আগে ১০ শতাংশ জমা দিলে এবং তার আদেশের বিরুদ্ধে আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আপিল করলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে পুনরায় ১০ শতাংশ পরিশোধ করতে হবে না। নতুন ভ্যাট আইনে এটির অনুপস্থিতি রয়েছে। চূড়ান্ত রায়ের আগে প্রতিবার দাবীকৃত অর্থ পরিশোধের এই শর্ত পূরণ একজন সৎ ব্যবসায়ীর জন্য আর্থিক বোঝা হতে পারে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে নতুন আইনে বিধানটি বহাল করার যুক্তিটি সামনে চলে এসেছে।

সার্বিকভাবে, এবারের ভ্যাটের বাজেট যেমন ব্যবসাবান্ধব, তেমনি রাজস্ববান্ধব। গত বছরে শুরু হওয়া নতুন ভ্যাট আইনে যে অপূর্ণতা ছিল, তা এবারের বাজেটে অনেকটাই দূর হয়েছে। বাজেটে ভ্যাট আহরণ প্রক্রিয়া যেমন সহজীকরণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, তেমনি দেশের বর্তমান বাস্তবতা (যেমন করোনার দুর্যোগ) বিবেচনায় আনা হয়েছে। অন্যদিকে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনাগুলোও অনাবৃত করা হয়েছে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন আইনটি আরো সহজ, প্রাঞ্জল ও অধিকতর ব্যবসাবান্ধব করা। বাজেটটি আইনে পরিণত হলে এনবিআরের নেতৃত্বে নতুন ভ্যাট ব্যবস্থা আরো বাস্তবায়নযোগ্য হবে এবং দেশে কর প্রদান ও আহরণের সংস্কৃতি তৈরি হবে এমনটি আশা করা যায়।

ড. মইনুল খান: কমিশনার অব কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট, ঢাকা পশ্চিম কমিশনারেট, এনবিআর
তথ্যসূত্র: বনিক বার্তা