কর বাবদ ১ কোটি ২৯ লাখ পাউন্ড দিলেন রাজা চার্লস কর বাবদ ১ কোটি ২৯ লাখ পাউন্ড দিলেন রাজা চার্লস পুরো বছরজুড়েই রিটার্ন জমা দেওয়া যাবেঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দর বৃদ্ধির শীর্ষে প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডসারাবছর রিটার্ন দাখিলের নতুন প্রস্তাববাজেটে বাড়তি শুল্ক-করে স্টিল উৎপাদনে প্রতিটনে ব্যয় বাড়বে ১২ হাজার টাকা
No icon

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল

বাংলাদেশে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সবসময়ই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। যদিও দেশের বিগত বছরগুলোর অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ ধরনের বিশেষ সুযোগ দিয়ে অতীতে খুব বেশি সুফল বা কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি।

তবে প্রতিবছরই জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট কিংবা বাণিজ্যিক স্পেস বা বাণিজ্যিক জায়গা ইত্যাদি স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনের অঙ্ক গোপন করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কম দামে দলিল করা এবং নগদ অর্থের অস্বচ্ছ ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর আবাসন ও ভূমি খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরি হচ্ছে, যা মূল অর্থনীতির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

এর ফলে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি অর্থনীতিতেও এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ হারানো অর্থ মূলধারার অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে একটি বিশেষ সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার।

মূলত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আইনি জটিলতা, সিস্টেমের গ্যাঁরাকল কিংবা মৌজা মূল্যের ফাঁদের কারণে যে অপ্রদর্শিত অর্থের জন্ম হয়, তা আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অত্যন্ত কঠোর শর্ত সাপেক্ষে বৈধ করার এই পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সরকারের এবারের খসড়া পরিকল্পনার প্রধান শর্ত হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষকেই তাদের নিজস্ব আয়কর রিটার্নের বা কর নথির বিবরণীতে সম্পদের প্রকৃত মূল্যের সঠিক ঘোষণা দিতে হবে। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষ যদি তাদের লেনদেনের প্রকৃত মূল্য স্বীকার করে কর নথিতে তা প্রদর্শন করেন, তাহলেই কেবল দেশের প্রচলিত সাধারণ হারে কর পরিশোধ করে ওই অর্থের বৈধতা বা সাদা করার সুযোগ মিলবে।

বিষয়টি একটি বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে স্পষ্ট করা যেতে পারে। ধরা যাক, একজন ফ্ল্যাটের মালিক ২ কোটি টাকায় তার একটি সম্পদ বা ফ্ল্যাট বিক্রি করলেন। কিন্তু ওই এলাকার সরকারি মৌজা রেট বা মৌজা মূল্য অনুযায়ী দলিল সম্পন্ন হলো মাত্র ৬৫ লাখ টাকায়। স্বাভাবিকভাবেই সরকারি সব কাগজপত্রে বা দলিলে ৬৫ লাখ টাকারই বৈধ প্রমাণ বা দলিল থাকবে। কিন্তু বাকি ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার কোনো বৈধ দলিল বা প্রমাণপত্র থাকবে না, যা অর্থনীতিতে অপ্রদর্শিত অর্থ হিসেবে গণ্য হবে।

এখন এই অবশিষ্ট ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বৈধ করতে হলে করদাতাকে তার আয়কর রিটার্নে পুরো ২ কোটি টাকারই ঘোষণা দিতে হবে। এই নিয়মটি সমভাবে বিক্রেতা এবং ক্রেতা উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই আয়কর রিটার্নে এই প্রকৃত মূল্যের অভিন্ন ঘোষণা থাকতে হবে। এরপর বিক্রেতাকে ওই ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বৈধ করতে দেশের প্রচলিত সাধারণ আয়কর স্ল্যাব বা করের স্তর হিসাবে করে সর্বোচ্চ হারে কর পরিশোধ করতে হবে।

এই বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসন্ন প্রস্তাবিত বাজেটে এই বিশেষ সুযোগটিকে তারা সরাসরি ‘কালো টাকা’ সাদা করার ঢালাও সুযোগ বলতে চান না। মূলত দেশের একটি ত্রুটিপূর্ণ বা দুর্বল ব্যবস্থার কারণে সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এই অপ্রদর্শিত অর্থের সৃষ্টি হয়। যতদিন পর্যন্ত ভূমি ও আবাসন খাতের এই মৌজা মূল্য বা দলিল সংক্রান্ত সিস্টেম পুরোপুরি সংস্কার করা না যাবে, ততদিনের এই খাতে এমন অপ্রদর্শিত অর্থের সৃষ্টি হতেই থাকবে।

এসব বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আগামী বাজেটে শর্ত সাপেক্ষে এই সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা দুই পক্ষকেই তাদের রিটার্নে সমপরিমাণ অর্থ দেখাতে হবে এবং করদাতাকে স্বাভাবিক নিয়মেই সর্বোচ্চ হারে কর দিতে হবে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন মেয়াদে আসা সরকারগুলো অর্থনীতিতে গতি আনতে কালো টাকা সাদা করার নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঐতিহাসিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত সর্বমোট প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করা হয়েছে। এর মধ্যে করোনা মহামারির সময়ে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ও বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত থাকায় ২০২০-২০২১ অর্থবছরে দেশের ইতিহাসের এক বছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড পরিমাণ কালো টাকা সাদা করা হয়েছিল।

সে বছর মোট ১১ হাজার ৮৩৯ জন ব্যক্তি প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাদা করেছিলেন এবং এই বিনিয়োগ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দুই হাজার ৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছিল। ওই বছর মাত্র ১০ শতাংশ ফ্ল্যাট বা নামমাত্র কর হারে কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে সুযোগ কিছুটা সীমিত ও শর্তযুক্ত করায় করদাতাদের সাড়া মারাত্মকভাবে কমে যায়। সে বছর মাত্র ২ হাজার ৩১১ জন করদাতা প্রায় ১ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা সাদা করেন। অন্যদিকে, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে (২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছর) দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছিল এবং সে সময় রেকর্ড ৩২ হাজার ৫৫৮ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই আইনি সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের (২০০৯-২০২৩) টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা সাদা করা হয়, যার সিংহভাগই এসেছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে। পরবর্তীতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ কর হারে এই সুবিধাটি আবারও নতুন করে চালু করা হয়েছিল।

তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যায়ক্রমে এই বিশেষ সুবিধা, বিশেষ করে আইনি দায়মুক্তির বিশেষ বিধানটি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়। বর্তমানে দেশের যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেকোনো খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে, তবে সেজন্য দেশের প্রচলিত সাধারণ হারে কর অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এবং প্রযোজ্য করের ওপর আরও ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে তা সাদা করতে হয়।

তবে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার এই সুযোগ করনীতির নৈতিক ভিত্তিকে চরমভাবে দুর্বল করে এবং নিয়মিত ও সৎ করদাতাদের প্রতি চরম বৈষম্য তৈরি করে বলে মনে করেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এই বিষয়ে বলেন, কালো টাকা সাদার সুযোগের মাধ্যমে অত্যন্ত সামান্য পরিমাণ করের অর্থ সরকারি কোষাগারে আসে।

কিন্তু এই সুযোগ যারা নিয়মিত ও সৎভাবে কর দেন, তাদের জন্য বড় ধরনের অনুৎসাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়। যদি একান্তই কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সুযোগ দিতেই হয়, তবে তা প্রচলিত স্বাভাবিক কর হারের চেয়ে অনেক বেশি কর এবং সাথে কঠোর জরিমানা দিয়ে সাদা করার সুযোগ দেওয়া উচিত।

অপরদিকে, কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান সম্প্রতি আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কোনো বিশেষ ছাড় বা আলাদা কোনো স্কিম ছাড়াই যে কেউ চাইলে দেশের বিদ্যমান মার্জিনাল বা গড় করহার (রেগুলার রেট) পরিশোধ করে তার অপ্রদর্শিত অর্থ আয়কর নথিতে প্রদর্শন বা সাদা করতে পারেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিদ্যমান করহার অনুযায়ী কর দিয়ে যে কেউ অপ্রদর্শিত অর্থ তার আয়কর নথিতে দেখালে তারা খুশিই হবেন। তবে বিগত ৫৪-৫৫ বছরে এ ধরনের অনেক বিশেষ সুবিধা বা স্কিম দেওয়া হলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হয়েছে। কারণ, এতে সৎ করদাতারা মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত হন এবং সারা বছর নিয়ম মেনে কর দেওয়া ব্যক্তিরা এটিকে ভালো চোখে দেখেন না।

তবে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) প্রতি বছরের মতো চলতি বছরের প্রাক-বাজেট আলোচনাতেও দেশের আবাসন খাতে কোনো ধরনের প্রশ্ন ছাড়াই কম কর দিয়ে অঘোষিত অর্থ বা কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে।