বড় করদাতারাই যখন ভরসা বিনিয়োগ করে যেভাবে কর কমাবেনরিটার্ন দেওয়ার কৌশলএক পাতার আয়কর রিটার্ন ফর্ম চালু করেছে এনবিআরহোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে ছাড়ের সময় বাড়ল
No icon

করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও চাপেই থাকবে মধ্যবিত্ত

বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করে নিচের দিকের, অর্থাৎ প্রান্তিক করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এত দিন যাঁরা একদম তলানিতে ছিলেন, এমন করদাতাদের কর দিতে হবে না। আর তলানির কিছুটা ওপরে থাকা করদাতাদের কর কম দিতে হবে। তাই বলা চলে, বছর শেষে তাঁদের খরচ কমবে। কিন্তু ওই সব করদাতার খরচ বেড়ে যাবে। কারণ, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কের মতো পরোক্ষ কর বাড়ানোয় অনেক নিত্যপণ্য ও সেবা কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হবে। ফলে লাভ-ক্ষতির হিসাবে খুব বেশি উপকৃত হবেন না প্রান্তিক করদাতারা। মধ্যবিত্তের ওপরও চাপ বাড়ল।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রস্তাব অনুযায়ী কোনো করদাতার বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকার কম হলে কোনো কর দিতে হবে না। এই সীমার ওপরে করযোগ্য প্রথম ১ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। এর মানে, ৪ লাখ পর্যন্ত টাকা আয় হলে ৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে।

এত দিন ৪ লাখ টাকা আয় হলে আড়াই লাখ টাকার ওপর কোনো কর ছিল না। পরের দেড় লাখ টাকার জন্য ১০ শতাংশ হারে ১৫ হাজার টাকা কর দিতে হতো। করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি ও করের হার কমানোর ফলে নিচের দিকে থাকা করদাতাদের খরচ কমল ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রথমবার অনলাইনে কর বিবরণী জমা দিলে দুই হাজার টাকা ছাড় মিলবে। এই ছাড় সব করদাতা পাবেন।

শুল্ক-কর কমিয়ে দেওয়ায় এই করোনায় ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী, যেমন পিপিই, মাস্ক, গগলস, ডিটারজেন্ট এসব কিনতে খরচ কমবে। যদিও এই খরচ নিয়মিত নয়। এত দিন এসব কিনতে হয়নি। ফলে এখন সুরক্ষাসামগ্রী কেনার জন্য প্রকারান্তরে সীমিত ও নিম্নমধ্যবিত্তের খরচ বাড়ল। স্থানীয় সরবরাহের ক্ষেত্রে চাল, আটা, আলু ইত্যাদির উৎসে কর ৫ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে। এসব পণ্যেও দাম কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে কতটা কমবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সব মিলিয়ে বলা চলে, প্রান্তিক করদাতারা শুধু করমুক্ত আয়সীমায় নগদ ছাড় পেলেন।

জানতে চাইলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর কমালে শুধু সংশ্লিষ্ট করদাতাদের ছাড় হয়। কিন্তু পরোক্ষ কর যেমন, শুল্ক-ভ্যাট বাড়ালে সবার ওপর চাপ পড়ে। এতে নিচের দিকে থাকা করদাতাদের খরচ বাড়ে। বাজেটে যেসব শুল্ক-করে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তাতে ছোট করদাতারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

পরোক্ষ কর বৃদ্ধির ফলে পদে পদে খরচ বাড়তে পারে। যেমন মুঠোফোনে কথা বলা, ভিডিও কল, গ্রুপ কনফারেন্স এসবে খরচ বাড়বে। মুঠোফোন সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। সীমিত ও মধ্যবিত্ত করদাতাদের দৈনন্দিন খরচের বাড়তি তালিকায় মুঠোফোন যোগ হলো। হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতি ১০০ টাকায় ৩ টাকা ক্রয়সক্ষমতা কমল।

মধ্যবিত্তের দুঃসময়ের জন্য ব্যাংকে রাখা টাকার ওপর শুল্ক বাড়ালেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকে ১০ লাখ টাকার বেশি রাখলেও আপনাকে বছর শেষে বাড়তি আবগারি শুল্ক দিতে হবে। ১০ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি টাকা থাকলে আগে দিতে হতো আড়াই হাজার টাকা। এখন দিতে হবে ৩ হাজার টাকা।

স্থানীয় সরবরাহ পর্যায়ে সব ধরনের প্রসাধনসামগ্রীর ওপর সম্পূরক শুল্ক দ্বিগুণ করে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে প্রসাধনসামগ্রীর দাম বাড়তে পারে। আসবাব বিক্রিতে ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। তবে বিক্রেতা যদি দাম না বাড়িয়ে আগের দামে বিক্রি করেন, তাহলে রক্ষা পাওয়া যাবে।

বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলাসহ দক্ষিণবঙ্গে যাতায়াতে লঞ্চ জনপ্রিয় পরিবহন। বাজেটে সেই লঞ্চের এসি টিকিটে ভ্যাট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে টিকিটের দাম বাড়বে।

প্রান্তিক করদাতারা আয়ের ওপর কর ছাড় পেলেও পরোক্ষ করের কারণে তাঁদের খরচ বাড়বে। এই চাপে কর ছাড়ের স্বস্তি মিলিয়ে যেতে পারে।