করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো উচিত ছিলকর-ভ্যাটের চাপ আরও বাড়বেবাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৩০ পণ্যে কমছে করভোগ্য পণ্যে শুল্ক কমানোর পরামর্শনতুন করের বোঝা না চাপানোর অনুরোধ ডিএসই’র
No icon

বাজেটের আকার ছোট রাখার পরামর্শ দিল আইএমএফ’র

বাজেটের আকার, বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব সংগ্রহ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে আইএমএফের বৈঠক চলবে ৮ মে পর্যন্ত। আগামী বাজেটের আকার ছোট রাখার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। পাশাপাশি সংস্থাটি বাজেট ঘাটতি কমিয়ে রাখা এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে পরামর্শ দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে এ কথা জানা গেছে। বাংলাদেশকে দেওয়া ঋণের শর্ত কতটা পূরণ হয়েছে, তা পর্যালোচনা করতে ঢাকায় আসা আইএমএফের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল গতকাল বুধবার অর্থ বিভাগের বৈঠক করে। সেই বৈঠকে আইএমএফের পক্ষ থেকে এমন পরামর্শ উঠে এসেছে। বাংলাদেশের দিক থেকে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং আইএমএফের গবেষণা বিভাগের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি শাখার প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও সংস্থাটির প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। আইএমএফের দল গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করে। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে দলটির বৈঠক চলবে আগামী ৮ মে পর্যন্ত। ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের সময় আইএমএফ রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যাংক খাত সংস্কারসহ বিভিন্ন শর্ত দেয়। ইতিমধ্যে সংস্থাটি দুই কিস্তিতে ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ছাড় করেছে। তৃতীয় কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা আগামী মাসের শেষ দিকে।

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। এ আকার কমিয়ে এরই মধ্যে সংশোধিত বাজেট ৭ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ৪ এপ্রিল আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার-সংক্রান্ত সমন্বয় কাউন্সিলের বৈঠকে আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার নিয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। সেটি হচ্ছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, আইএমএফের পরামর্শের আগেই চলতি বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেটের আকার খুব বেশি না বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে সরকারের। বাজেটের মূল আকার প্রতি অর্থবছরে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ করে বাড়ানো হয়। এবারই প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার ৫ শতাংশের কম বাড়ানো হবে। কোনো সরকারের এক অর্থবছরের আয়ের তুলনায় ব্যয় যতটা বেশি হয়, তাকে বলা হয় বাজেট–ঘাটতি। চলতি অর্থবছরে অনুদানসহ বাজেট ঘাটতি ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ২ শতাংশ অর্থাৎ ২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। এ ঘাটতি যেন অর্থবছর শেষে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে না যায়—গতকালের বৈঠকে এমন পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। বিদেশ ও দেশ থেকে ঋণ নিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণ করা হয়। দেশ থেকে নেওয়া ঋণের অংশই বেশি। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ঋণ গ্রহণ। ১৮ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে কোনো অর্থ সংগ্রহ করতে পারেনি সরকার। ফলে এবার ব্যাংকঋণই সরকারের প্রধান ভরসা। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের গতি কম বলে মনে করে আইএমএফ।

চলতি অর্থবছরের সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, বৈদেশিক অনুদানসহ ৫ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রধান অংশ ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত রাজস্ব। লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে এরই মধ্যে তা ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। সূত্রগুলো জানায়, আইএমএফকে জানানো হয়েছে, রাজস্ব সংগ্রহে গত জুলাই–ডিসেম্বরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আইএমএফ দেখতে চায় পুরো অর্থবছরের প্রবণতা। আইএমএফকে জানানো হয়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চে এনবিআর আদায় করেছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। তবে ৯ মাসের লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। বাংলাদেশকে দেওয়া ঋণের অনেক শর্তের মধ্যে কর-জিডিপির হার বৃদ্ধির শর্তও রয়েছে আইএমএফের। সেটি হচ্ছে স্বাভাবিক বৃদ্ধির চেয়ে চলতি অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ যাতে জিডিপির তুলনায় দশমিক ৫ শতাংশ হারে রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে, সেই কৌশল ঠিক করতে হবে। অর্থ বিভাগ আইএমএফকে বলেছে, এ বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে।

অর্থ বিভাগের সঙ্গে আইএমএফের বৈঠকের আলোচনার বিষয় নিয়ে সংস্থাটির সাবেক কর্মকর্তা ও গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আইএমএফ যদি বাজেট ছোট করা, ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়া ও রাজস্ব আদায়ে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলে থাকে, আমাদেরও একই কথা। অর্থবছর শেষে দেড় লাখ কোটি টাকা যদি ব্যাংক খাত থেকেই ঋণ নিতে হয়, এর তো সুদও তো দিতে হবে। ফলে ঋণের প্রয়োজনীয়তা কমাতে হবে এবং বাজেট কাটছাঁট করতে হবে। আহসান এইচ মনসুর বলেন, তেল-গ্যাসও কেনা হচ্ছে ধারের টাকায়। সংসারের উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, ধার করে বাড়ি-গাড়ি কেনা যায়। কিন্তু চাল কেনার টাকাও যদি ধার করতে হয়, অবস্থাটাকে তাহলে স্বস্তিদায়ক বলা যায় না। আমাদের অবস্থা অনেকটা ও রকমই।