জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি পৃথক বিভাগে বিভক্ত করার দীর্ঘদিনের আলোচিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী সংসদ অধিবেশনে একটি বিল উত্থাপন করতে পারে সরকার। এ লক্ষ্যে সরকার গঠিত একটি কমিটি প্রস্তাবিত পুনর্গঠনের বিষয়ে সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ গঠনের প্রক্রিয়া এবং বিভাগ দুটির মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।তবে বিভাগ দুটির নেতৃত্ব কাঠামোর বিষয়ে সরকার কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখছে বলে জানা গেছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান হিসেবে আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।এদিকে, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী রাজস্ব নীতি বিভাগকে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালনার পক্ষে মত দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিভাগটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চাইছেন। ফলে এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন না-ও হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের তিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী সংসদ অধিবেশনে এ-সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করা হতে পারে। তবে সংসদে বিলটি পাস হলেও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগায় নতুন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে পারে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বাধীন নয় সদস্যের কমিটি ইতোমধ্যে তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে। তবে কমিটির কয়েকজন সদস্য প্রস্তাবের কিছু অংশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও এ বিষয়ে কমিটির প্রধান মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, সদস্য রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের বক্তব্য জানতে পারেনি ।পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, এনবিআরকে আরও অনেক আগেই দুটি পৃথক বিভাগে বিভক্ত করা উচিত ছিল। তবে দেরিতে হলেও এ উদ্যোগ নেওয়া ভালো।তিনি বলেন, কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ বিভাজন রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কারে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।তিনি আরও বলেন, শুধু বিভক্ত করার জন্যই এনবিআরকে বিভক্ত করা উচিত নয়। পুনর্গঠনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য কীভাবে অর্জন করা যায়, তা সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
রাজস্ব সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ
রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পৃথক করার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে এনবিআর পুনর্গঠনের উদ্যোগ চলছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সমর্থনপুষ্ট এ সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এনবিআরকে দুটি বিভাগে বিভক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।এর আগে ২০২৫ সালের ১২ মে অন্তর্বর্তী সরকার বৃহত্তর রাজস্ব সংস্কারের অংশ হিসেবে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের অধ্যাদেশ জারি করেছিল।তবে এ উদ্যোগের প্রতিবাদ জানান আয়কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তাদের অভিযোগ ছিল, রাজস্ব সংস্কার কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে পুনর্গঠনের মাধ্যমে তাদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বিভাগ দুটির নেতৃত্বে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অযৌক্তিকভাবে বেশি নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে।পরবর্তী সময়ে কর্মকর্তারা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করলে বিরোধ আরও তীব্র হয়। সে সময় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ৩০ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত, পাঁচজনকে অবসরে পাঠানো এবং কয়েক শ কর্মকর্তাকে বদলি করে বলে অভিযোগ ওঠে।এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে।
তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সংশোধিত গেজেট জারির পর কিছু উদ্বেগ দূর হলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি রয়ে যায় বলে জানা গেছে।পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের আগে বিভাগ দুটি কার্যকর করার আরেকটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিরোধিতায় তা আটকে যায় বলে জানা গেছে।গত ২৮ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব তানভীর আহমেদ এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সাত সচিবকে আইনি নোটিশ পাঠান। একই সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বাতিলের দাবি জানান।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রশাসন ক্যাডারের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নির্বাচনের আগে বিভাগ দুটিতে সচিব নিয়োগের পরিকল্পনা বাতিল করতে তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছিলেন।এরপর উদ্যোগটি থমকে যায়। তবে এনবিআর পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সুপারিশ থাকায় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
