ভ্যাট ও আয়কর সনদ জুয়েলারি শো-রুমে প্রদর্শন করুন : বাজুসকরজাল সম্প্রসারণে এনবিআরের মহাপরিকল্পনা, ‘টার্গেট’ বাড়িওয়ালারাওজ্বালানি খাতে বকেয়া শুল্ককর ৫৫ হাজার কোটি টাকাবাড়বে ভ্যাট, বাড়তি দামের চাপে ভুগতে হবে ভোক্তাদের। অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ দাম বাড়াচ্ছে পাইপের
No icon

সব ক্ষেত্রে ভ্যাট ১৫ শতাংশ হতে পারে

আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে। এ ভ্যাট পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করার বিধানও রাখা হতে পারে। তবে বাড়তি মূল্যস্ফীতির এ সময়ে সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট নেওয়া হলে নিম্ন আয়ের মানুষ চাপে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এর আগে ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সুপারিশের ভিত্তিতে সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু ব্যবসায়ীদের তীব্র সমালোচনার পর ভ্যাট আইন সংশোধন করে বিভিন্ন খাতে ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ, সাড়ে ৪ শতাংশ, সাড়ে ৭ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কাটার বিধান রয়েছে। আগামী বাজেটে এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিভিন্ন কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে, ভ্যাট নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই একেক সময় একেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আসছে না। তবে এ ধরনের বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, তীব্র সমালোচনার মুখে ভ্যাটের বিভিন্ন রেট নির্ধারণ করে জাতীয় সংসদে ভ্যাট আইন পাস হয়েছে। এখন আবার হুট করে সেই আগের নিয়ম তথা সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হবে বলে বলা হচ্ছে। এমনিতেই বর্তমানে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ ভালো অবস্থায় নেই। এ অবস্থায় আবার বাড়তি ভ্যাট কেন?

এ প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মিষ্টির দোকানসহ সেবা খাতে ৭ থেকে ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণ করা যেতে পারে। এ ছাড়া ভ্যাট আদায় বাড়াতে অটোমেশন কার্যক্রম জোরদার করার পরামর্শ দেন তিনি।এবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, সিগারেট, টেলিফোন ও মোবাইল ফোন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পেট্রোলিয়াম পণ্য, সিমেন্ট খাত থেকে মোট ভ্যাটের বড় অংশ আসে। কিন্তু চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং ডলার সংকটের কারণে অনেক খাতের অবস্থা ভালো নয়।তাই কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব না আসার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত হিসেবে আগামী দুই অর্থবছর কর-জিডিপির অনুপাত শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং তার পরের বছর শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়াতে হবে। তাই সম্প্রতি এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে ভ্যাট থেকে রাজস্ব বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।

ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভ্যাট থেকে ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করতে চায় সরকার। একইভাবে আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে ২ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে।বর্তমানে ভ্যাটের হার বিভিন্ন হওয়ায় রাজস্ব কম হওয়ার পাশাপাশি ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ থাকে। তাই আগামী বাজেটে একক হার বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভ্যাট আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (ইএফডি) বা ভ্যাটের মেশিনের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। বর্তমানে সারাদেশের বিভিন্ন দোকানে ৯ হাজার ৯৭টি ইএফডি মেশিন বাসানো রয়েছে। আগামীতে প্রতিবছর ৬০ হাজার করে ছয় বছরে ৩ লাখ ইএফডি মেশিন বাসানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে এনবিআর।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ভ্যাট নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা রয়েছে বলে মনে হয় না। অংশীজনের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই ভ্যাট নিয়ে একেক সময় একেক সিদ্ধান্ত হচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একটি বিপণিবিতানের ১০০টি দোকানের মধ্যে হয়তো ১০টি দোকানে ইএফডি মেশিন বসানো হচ্ছে। ভ্যাট দিতে হবে তাই ক্রেতারা ওই ১০টি দোকানে কেনাকাটা করছে না। এভাবে বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তে ১৫ শতাংশ কেন আরও বেশি ভ্যাট আরোপ করা হলেও রাজস্ব আদায় তেমন বাড়বে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।তিনি বলেন, একটি পণ্য উৎপাদন বা আমদানির পর খুচরা দোকানে আসার আগেই তিন থেকে চারবার ভ্যাট আদায় করা হয়। এর পর সব খরচ ধরে যখন খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়, এর ওপর আবার ১৫ শতাংশ ভ্যাট জনগণের জন্য বাড়তি বোঝা। তবে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে যদি সরকার ভ্যাট আদায় করতে চায়, তাহলে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ ভ্যাট দেয় জনগণ।