করপোরেট কর কমছে বাড়ছে সম্পদ করসংবাদপত্রের করপোরেট করহার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব সম্পাদকদেরআরজেএসসি ঘরে বসেই কোম্পানি নিবন্ধনের সেবা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলা খারিজ হয়নি : বাংলাদেশ ব্যাংকরাশিয়ার ঋণের পরিমাণ ২৬ হাজার ১৭০ কোটি মার্কিন ডলার প্রায়
No icon

রাশিয়ার ব্যাংকগুলো সুইফট পেমেন্ট–ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন

রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট–ব্যবস্থা সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সম্মত হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো। আজ বিশ্ব গণমাধ্যমের এটাই প্রধান খবর। সবাই এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে বসে গেছেন, এতে রাশিয়ার কী পরিণতি হবে।
 তবে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোকে সুইফট পেমেন্ট–ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। তবে পার্থক্য হচ্ছে, এত দিন তা হুমকির পর্যায়ে থাকলেও এবার বাস্তব রূপ নিয়েছে।

গত বছর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এক প্রস্তাব পাস হয়। এতে বলা হয়েছিল, রাশিয়া যদি ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায়, তাহলে রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক সুইফট থেকে বাদ দেওয়া হবে। এই প্রস্তাবের আইনি ভিত্তি না থাকলেও রাশিয়া নড়েচড়ে বসে।

 এর আগে ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ করলে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আবেদন জানায়, রাশিয়ার বিরুদ্ধে এমন কিছু করা যায় কি না অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে তাকে সারিয়ে দেওয়া যায় কি না। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আলেক্সেই কুদরিন বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলে রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো তখন সেই পথে হাঁটেনি। কিন্তু রাশিয়া এবার ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করায় পশ্চিমা দেশগুলো আর বসে থাকেনি। কারণ, তৎকালীন রুশ প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছিলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।
রাশিয়ার কিছু ব্যাংক এবার সুইফট নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ক্ষতি হবে তা নিশ্চিত। কিন্তু যারা এ ব্যাপারে সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করল, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, তারাও এতে কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ, রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সুইফট ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ করে মার্কিন ও জার্মানির ব্যাংকগুলো।

রাশিয়ার ক্ষতিও নেহাত কম হবে না—অন্তত স্বল্প মেয়াদে। বিশ্বে গ্যাস ও তেল রপ্তানিতে রাশিয়া শীর্ষ দেশ। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তারা মার্কিন ডলারে এই তেল ও গ্যাসের বাণিজ্য করে থাকে। ফলে এখন আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে রাশিয়া বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। এতে মুদ্রার মান পড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মুদ্রা পাচারের শঙ্কা দেখে দেবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

রাশিয়ার বিকল্প ব্যবস্থা
তবে ২০১৪ সাল থেকেই এসব হুমকি-ধমকি চলতে থাকায় নিজের আর্থিক ব্যবস্থা সুরক্ষিত করতে রাশিয়া ইতিমধ্যে বেশ কিছু সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। জানা গেছে, ভিসা ও মাস্টারকার্ড পেমেন্ট ব্যবস্থা থেকে বিযুক্ত হলে রাশিয়ার পক্ষে অভ্যন্তরীণ লেনদেন করা সম্ভব হবে, তবে আন্তর্জাতিক লেনদেন করা সহজ হবে না।
২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখলের পর যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বেশ কিছু ব্যাংককে কালো তালিকাভুক্ত করে। ভিসা ও মাস্টারকার্ড বেশ কয়েকটি ব্যাংকের সেবা বন্ধ করে দেয় এবং তাদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে বাধা দেয়। পরের মাসে রুশ সরকার নতুন এক আইন পাস করে ন্যাশনাল পেমেন্ট কার্ড সিস্টেম প্রবর্তন করে-পরবর্তীকালে যা এমআইএর নামে পরিচিত হয়। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শতভাগ নিয়ন্ত্রণাধীন এই কার্ড–ব্যবস্থা রাশিয়ার অভ্যন্তরে লেনদেন প্রক্রিয়াজাতকরণে ক্লিয়ারিং সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এরপর ২০২০ সালের মধ্যে দেশটির অভ্যন্তরীণ কার্ড লেনদেনের ২৪ শতাংশ এর মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়।

তবে রাশিয়ার বাইরে এখনো মীরের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করা সহজ নয়। শুধু আর্মেনিয়া ও রাশিয়া-সমর্থিত দক্ষিণ ওসেটিয়া এবং আবখাজিয়ার জর্জিয়ান অঞ্চলে এর পূর্ণাঙ্গ পরিষেবা মেলে। তুরস্ক, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তানে এর আংশিক কার্যক্রম আছে। আন্তর্জাতিক মায়েস্ট্রো সিস্টেম, চায়নিজ ইউনিয়নপে ও জাপানিজ জেসিবির সঙ্গে কো-ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে কিছু লেনদেন করা যায় মিরের মাধ্যমে। তবে নাম দেখে তাকে বৈশ্বিক কার্ড হিসেবে ঠাহর হলেও বাস্তবে সে তেমন কিছু নয়।

মধ্যমেয়াদে রাশিয়ায় অভ্যন্তরীণ লেনদেনের ক্ষেত্রে সুইফটের বিকল্প হতে পারে সিস্টেম ফর ট্রান্সফার অব ফাইন্যান্সিয়াল মেসেজ বা এসপিএফএস। এটাও সেই ২০১৪ সালের পর প্রতিষ্ঠিত। সুইফটের বিকল্প হিসেবেই এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।


২০২০ সালে এসপিএফএসের মাধ্যমে লেনদেন ১ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছায়। কিন্তু সুইফটের তুলনায় এখনো সে তেমন কিছু নয়। ৪০০টির বেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার এই বিকল্প ব্যবস্থায় যোগ দিয়েছে, যার বেশির ভাগই রাশিয়ান ব্যাংক, তবে রাশিয়ায় পরিচালিত বিদেশি ব্যাংক, যেমন ইউনিক্রেডিট, ডয়েচে ব্যাংক, রাইফেইসেন ব্যাংক, টিঙ্কফ ও ভোস্টোচনি ব্যাংকগুলো এখনো যোগ দেয়নি। নতুন সদস্যদের আকৃষ্ট করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সিস্টেমের শুল্ক কমিয়ে সুইফটের প্রায় অর্ধেক করে ফেলে।

গত বছর পর্যন্ত রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ লেনদেনের ২০ শতাংশ হয়েছে এসপিএফএসের মাধ্যমে। রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। তবে তাদের কিছু প্রযুক্তিগত সদস্যা আছে—শুধু কর্মদিবসে এর সেবা মেলে, যেখানে সুইফট ২৪ ঘণ্টাই সেবা দেয়। ফলে অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও এই ব্যবস্থা এখনো সুইফটের সমকক্ষ হয়নি।

চীনের উদ্যোগ
এ অবস্থায় চীনের ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমকে (সিআইপিএস) বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে ভাবছে রাশিয়ার ব্যাংকগুলো। আর সিআইপিএসের গুরুত্ব বৃদ্ধির ঘটনায় ধারণা করা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার রুবলের চেয়ে চীনের মুদ্রা ইউয়ানের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

তবে সুইফটের বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য স্থান দখল করতে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে সিআইপিএসকে। আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে চীনের মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার ২ শতাংশের কম—মার্কিন ডলারের ব্যবহার ৪০ শতাংশ। এমনকি ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড কিংবা জাপানি মুদ্রা ইয়েনের তুলনায়ও পিছিয়ে আছে ইউয়ান।

তবে বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, কম ব্যবহার সত্ত্বেও বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সুইফটের আঞ্চলিক বিকল্প হয়ে উঠতে পারে সিআইপিএস। যেমন ইউরেশিয়া অঞ্চলে এর একক ব্যবহার শুরু হতে পারে। এ ছাড়া সিআইপিএসের ওপর রাশিয়ার নির্ভরতা বাড়ছে। সম্প্রতি রাশিয়ার ২৩টি ব্যাংক সিআইপিএস ব্যবস্থায় যোগ দিয়েছে—বিপরীতে কেবল ব্যাংক অব চায়না রাশিয়ার এসপিএফএস ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। তাই বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সুইফটের বিকল্প হতে চীন কি রাশিয়ার এসপিএফএসকে সঙ্গে নিয়ে এগোবে, নাকি নিজেরাই এককভাবে সিআইপিএসের প্রসার ঘটাতে চাইবে।

অন্যদিকে আর্থিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে ২০২০ সাল থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ডিজিটাল মুদ্রার প্রচলন করেছে রাশিয়া। ক্রিপ্টোকারেন্সির পরিবর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ডিজিটাল মুদ্রা প্রচলনে চীন ও রাশিয়া এখন অগ্রণী। এতে ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।

তবে রাশিয়ার বাইরে অর্থ প্রদানের মাধ্যম হিসাবে ডিজিটাল রুবলকে সবাই হয়তো সহজে গ্রহণ করবে না। যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দেশ কিংবা তুরস্কের মতো ভারসাম্য রক্ষাকারী দেশে এর ব্যবহার হতে পারে। যত যা–ই হোক, তা আঞ্চলিক গণ্ডিতেই থাকবে। আবার ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে পাশ কাটানো হয়তো সম্ভব হবে না রাশিয়ার পক্ষে। কারণ, ২০১৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার আওতায় ডিজিটাল মুদ্রায় লেনদেনও যুক্ত করেছে। তবে সুইফটে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) মানতে চায় না।
ইরানের ওপর সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ইইউর অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নাখোশ হয়েছিল। সে সময় সুইফটের বিকল্প হিসাবে ইইউ ইনস্ট্রুমেন্ট ফর সাপোর্টিং ট্রেড এক্সচেঞ্জেস (ইনসটেক্স) চালু করে। ইইউ ভবিষ্যতে ইনসটেক্সের কার্যকারিতা উন্নত করার পরিকল্পনা করছে। রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যে এতে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি তারা ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো পেমেন্ট কার্ডের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে। তাই সুইফটের বিপরীতে ইইউর এই প্রচেষ্টা রাশিয়া ও চীনকে বিকল্প তৈরিতে সাহায্য করবে।

বিষয়টি হলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় পুতিন অনেক দিন ধরে পরিকল্পনা করছিলেন। অনেক বিশ্লেষক অবশ্য মনে করেন, এই নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে তেমন একটা বিপদে ফেলতে পারবে না। তবে সুইফট থেকে বাদ পড়া নিঃসন্দেহে বড় ঘটনা। হয়তো পুতিন সেটা প্রত্যাশা করেননি।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শুধু রাশিয়া নয়, পুরো পৃথিবীর অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করবে। পশ্চিমা বিশ্বও খুব বেশি দিন তা সহ্য করতে পারবে না। ইউরোপ একেবারেই পারবে না অথবা জার্মানি ও ইতালি সেই ভার বইতে পারবে না। গ্যাসের জন্য তারা রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়া গ্যাস বন্ধ করে দিলে এই দুই দেশের অর্থনীতি রীতিমতো ভেঙে পড়বে।

সূত্র: কার্নেগি মস্কো সেন্টার, ওয়াশিংটন পোস্ট