সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সম্প্রতি এ রায় দেয়া হয়। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
সান্টা ফে শহরের রাজ্য বিচারক ব্রায়ান বিডশেড বৃহস্পতিবার মেটাকে অতিরিক্ত ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেন। এর আগে গত মার্চে এ মামলার জুরি বোর্ড মেটাকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানার নির্দেশ দিয়েছিল। দুটি জরিমানা মিলিয়ে মেটার মোট দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলারে।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল ২০২৩ সালে মেটার বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার তথ্যানুযায়ী, প্লাটফর্ম পরিচালনায় অসচেতনতার কারণে মেটার বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অনৈতিক যোগাযোগ, ডিজিটাল শোষণ ও পাচারকারী চক্রের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মেটা নিজের প্লাটফর্মের প্রচার ও ব্যবহারকারীদের ধরে রাখার জন্য এমন কিছু অ্যালগরিদম বা অ্যালগরিদমভিত্তিক সুপারিশ ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা কম বয়সী শিশুদের ক্ষতিকর কনটেন্টের দিকে নিয়ে যায়। এটি নিউ মেক্সিকোর ‘আনফেয়ার প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট’ বা অসাধু ব্যবসা আচরণ আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিচারক ব্রায়ান বিডশেড রায়ে উল্লেখ করেন, কারখানার নির্গত ক্ষতিকর ধোঁয়া যেমন বিশুদ্ধ বাতাসের অধিকারকে ধ্বংস করে, ঠিক তেমনই মেটার অ্যাপগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব শুধু এর স্ক্রিনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি শিশু, তাদের পরিবার, স্কুল, হাসপাতাল ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর একটি বড় ধরনের সামাজিক ও সার্বিক বোঝা তৈরি করে।
সান্টা ফে আদালতের রায়ে নিউ মেক্সিকোর তরুণ ও কিশোর-কিশোরীদের ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের কথা বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বিচারক জানান, অঙ্গরাজ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে চরম বিষণ্নতা, খাদ্যাভ্যাসের ব্যাধি (ইটিং ডিজঅর্ডার) এবং আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল প্রকাশিত ২০২৩ সালের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করে বিচারক বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ও আসক্তিকর ব্যবহার শিশুদের মানসিক সংকটকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। ব্যবহারকারীদের বেশিক্ষণ অ্যাপে আটকে রাখার জন্য ডিজাইন করা ফিচারগুলোই এর মূল কারণ।’
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, জরিমানার মোট অর্থের মধ্যে প্রায় ৪২ কোটি ডলার সরাসরি কমিউনিটি ও পরিবারভিত্তিক চিকিৎসা কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে। বাকি অর্থ শিশুদের ওপর ক্ষতিকর আচরণ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম ও সামাজিক পুনর্বাসনে ব্যবহার হবে।
শুধু অর্থদণ্ডেই শেষ নয়, আদালত মেটাকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও অ্যাপগুলোয় তাৎক্ষণিক কয়েকটি পরিবর্তন আনার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে টিন ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা, অর্থাৎ ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় নতুন ব্যবস্থা চালু ও বজায় রাখা।
১৩ বছরের কম বয়সীদের নজরদারি। শিশু যাতে ভুয়া তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে না পারে, তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এছাড়া এআই চ্যাটবটের ওপর নিষেধাজ্ঞা। মেটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত চ্যাটবটগুলোর সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের কোনো ধরনের সংবেদনশীল, অনাকাঙ্ক্ষিত বা নীতিবহির্ভূত বার্তা আদান-প্রদান রোধে কঠোর প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
তবে সান্টা ফে আদালতের এ রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে মেটা। ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কোম্পানিটি এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবে।
মেটার এক মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা প্লাটফর্মগুলো নিরাপদ রাখতে কঠোর পরিশ্রম করি এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট বা অসৎ ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করে সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে সবসময় স্বচ্ছ ছিলাম। তরুণদের সুরক্ষায় আমাদের যে রেকর্ড রয়েছে সে বিষয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী। বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে করা এ দাবির বিরুদ্ধে আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।’

